গাজা ও লেবাননের জনপদে একের পর এক বর্বরতা, নির্বিচার, হত্যাকাণ্ড, নারী নির্যাতন ও লুটপাটের যেসব ঘটনা দিনের পর দিন ঘটছে, তা ইসরাইলি সেনাবাহিনীর অনেক সদস্যই এখন আর মানসিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না। ইসরাইলের প্রভাবশালী দৈনিক হারেৎসের এক সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়ংকর ও লোমহর্ষক চিত্র।

গত এপ্রিল মাসে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে আটজন সেনা ও পুলিশ সদস্য এবং তিনজন সাবেক রিজার্ভ সেনা নিজেদের জীবন নিজেদের হাতেই শেষ করে দিয়েছেন। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ১০ জন সেনা আত্মহত্যা করেছেন। অথচ এই চরম সঙ্কটের মুহূর্তেও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বরাদ্দ কমানোর সাথে সাথে মাঠপর্যায়ের নানা জরুরি সহায়তা কর্মসূচি ও কাউন্সেলিং সেশনগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে।

মূলত গাজা ও লেবাননে চালানো অমানুষিক নৃশংসতার দায় আর অবদমিত অপরাধবোধই এখন বুমেরাং হয়ে ফিরে আসছে তাদের নিজের ঘরে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রভাব ইউনিফর্ম খুলে রাখার পরও শেষ হচ্ছে না, বরং তা ইসরাইলি সেনাদের ভেতরে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করছে। যা মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে পুরো বাহিনীকে।

ঘাতক যন্ত্র যখন নিজের দিকেই তাক করা : ইতিহাসের কঠিন শাস্তি

ইসরাইল নামের কৃত্রিম রাষ্ট্রটি এতকাল ধরে তাদের সেনাদের নিছক এক ‘কিলিং মেশিন’ বা ঘাতক যন্ত্রে পরিণত করতে চেয়েছে। অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ড, গাজা উপত্যকা বা লেবানন- প্রতিটি ভূখণ্ড সাক্ষ্য দেয় যে, এই ধ্বংসাত্মক ও অমানবিক প্রকল্পে ইসরাইল আপাতদৃষ্টিতে সফলও হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ের বাস্তবতা বলছে অন্য কথা।

এখন দেখা যাচ্ছে, সেই ঘাতক যন্ত্রগুলো নিজেদের দিকেই লক্ষ্যস্থির করে তাক করা হয়েছে। তারা নেমেছে এক আত্মঘাতী খেলায়। একে আসলে বলা যেতে পারে ইতিহাসের এক অনিবার্য ও কঠিন শাস্তি।

দীর্ঘকাল ধরে ইসরাইলের সাধারণ মানুষ, সেনাদের স্বজন-পরিজন বা মা-বাবারা বিনা প্রশ্নেই তেল আবিবের এই পাশবিক যুদ্ধ পরিকল্পনা আর আগ্রাসনে সায় দিয়ে গেছে। ইহুদিদের কথিত প্রতিশ্রুতি ভূখণ্ড গঠনের এবং দুধ-মধুর নহর বইবে এমন আশায় দিন কেটেছে। তারা কখনো ভাবেনি যে, এই নিষ্ঠুরতার আঁচ তাদের নিজেদের আঙিনাতেও এসে পড়বে। আজ যখন তাদেরই সন্তান বা প্রিয়জন পিটিএসডির অসহ্য যাতনা সহ্য করতে না পেরে একের পর এক আত্মঘাতী হচ্ছে, তখন কি শেষ পর্যন্ত ইসরাইলি জনগণের এই অন্ধ মোহ ভাঙবে? তাদের হুঁশ কি এবার ফিরবে?

তেল তৎপরতা ও ইহুদি পরিবারের সম্মিলিত মৌনতা যে শেষ পর্যন্ত তাদেরই প্রিয়জনদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।

পিটিএসডি : মনের গভীরের এক অদৃশ্য ও ভয়ংকর যুদ্ধ

গাজা ও লেবানন যুদ্ধে অংশ নেয়া ইসরাইলি সেনাদের মধ্যে বর্তমানে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে।

বিষয়টিকে সহজ ও সরল ভাষায় ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়- এটা মানুষের মনের ভেতরে তৈরি হওয়া এক গভীর ও অদৃশ্য ক্ষত। যখন কোনো মানুষ যুদ্ধের ময়দানে চরম বীভৎসতা নিজের চোখে দেখে কিংবা নিজের হাতে কোনো অসহায় মানুষের ওপর নিষ্ঠুর কাজ চালায়, তখন সেই সব স্মৃতি তার মস্তিষ্ক থেকে আর মুছে যায় না। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শরীর নিয়ে সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরলেও তার মন ও আত্মা পড়ে থাকে সেই ধ্বংসস্তূপ আর লাশের স্তূপের মাঝেই। রাতে ঘুমাতে গেলে নিথর দেহের দুঃস্বপ্ন তাকে তাড়া করে ফেরে, সামান্য টু শব্দেও তিনি আতঙ্কে আঁতকে ওঠেন, তার মনে হয় আবার সেই রক্তক্ষয়ী ঘটনাই চোখের সামনে ঘটছে। ধীরে ধীরে মানুষটি ভেতর থেকে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং একসময় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চরম হতাশায় ডুব দেয়।

ইসরাইলি সেনারা এখন এই অদৃশ্য যুদ্ধের ময়দানে শোচনীয়ভাবে হেরে যাচ্ছেন, যার কোনো সমাধান বুলেট, কামানে কিংবা অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে নেই।

হারেৎসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গাজা যুদ্ধে অংশ নেয়া সেনাদের মধ্যে এই পিটিএসডি এখন প্রায় মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যারা সরাসরি হামলায় যুক্ত ছিলেন—ড্রোন অপারেটর, বুলডোজার চালক বা উদ্ধারকাজে থাকা সদস্যদের ওপর এই মানসিক চাপ সবচেয়ে বেশি। একজন ড্রোন অপারেটর স্বীকার করেছেন যে, তিনি এই যুদ্ধের ভয়াবহ দৃশ্য আর সহ্য করতে পারছিলেন না।

রাষ্ট্রের নিষ্ঠুর উদাসীনতা ও সেনাদের নীরব আর্তনাদ

হারেৎসের অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের মানসিক সমস্যায় ভুগতে থাকা সেনাদের কোনো বিশ্রাম না দিয়ে আবারো জোর করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে। এমনকি কেউ যেতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের গ্রেফতারের হুমকিও দেয়া হচ্ছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে এখনো সেই পুরনো মানসিকতা রয়েছে- যেখানে মানসিক অসুস্থতাকে ‘দুর্বলতা’ বা ‘কাপুরুষতা’ হিসেবে দেখা হয়।

বাজেটে অর্থের টানাটানির দোহাই দিয়ে গাজা থেকে ফেরা সেনাদের জন্য রাখা বিশেষ চিকিৎসাসেবা ও পুনবার্সন কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। গাজা থেকে ফেরার পর যখন সমাজ বা রাষ্ট্র একজন সেনাকে ‘বীর’ হিসেবে সংবর্ধনা দেয়, সেই সেনাটি তখন নিজের ভেতরে নিজেকে একজন ‘দানব’ হিসেবে আবিষ্কার করে থাকে। একজন ড্রোন অপারেটর তো সরাসরি সামরিক কর্মকর্তাদের বলেই দিয়েছেন যে, পর্দার ওপারে মানুষের ওপর একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে মারার সেই বীভৎস দৃশ্যগুলো দেখার ক্ষমতা তিনি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি আর এই ভয়ংকর দৃশ্যগুলো নিজের স্মৃতিতে বয়ে বেড়াতে পারছেন না।

রেকর্ড ভাঙা আত্মহত্যার মিছিল ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

হারেৎসের দেয়া তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ বছরের ইতিহাসে গত বছরেই ইসরাইলি সেনাদের মধ্যে আত্মহত্যার হার ছিল সবচেয়ে বেশি । এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে বছরে গড়ে ১২ জন সেনা আত্মহত্যা করতেন, কিন্তু গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এই সংখ্যা বেড়ে ২০ থেকে ২২ জনে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া যারা সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর কিংবা ছুটিতে গিয়ে গোপনে আত্মহত্যা করেছেন- তাদের হিসাব ইসরাইলি সেনাবাহিনী অনেক সময় সুকৌশলে এড়িয়ে যায় বা সাধারণ হিসাবের বাইরে রাখতে চায়। এমনকি যুদ্ধের ভয়াল স্মৃতি ভুলতে না পেরে অনেক সেনাই এখন মাদক বা অতিরিক্ত অ্যালকোহলের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকছেন এবং পরে নেশার ঘোরে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন।

ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ বর্তমানে আত্মহত্যার এই বিষয়টিকে আড়াল করতে একে ‘জাতীয় শোক দিবসের আবেগীয় প্রভাব’ বলে চালানোর অপচেষ্টা করছে। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের এই ছলচাতুরী বোঝার জন্য আমাদের তাকাতে হবে মে মাসে পালিত তাদের তথাকথিত ‘জাতীয় শোক দিবস’ বা ‘মেমোরিয়াল ডে’-এর দিকে। প্রতিবছর মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে যখন এই দিনটি আসে, তখন ইসরাইলজুড়ে কান্নার এক কৃত্রিম আবহ তৈরি করা হয়, যার মূল উদ্দেশ্য হলো ইসরাইলবাসীদের মনে উগ্র দেশপ্রেম জাগিয়ে রাখা। তেল আবিব এই দিনটিকে এমনভাবে সাজায় যেন শোকের আড়ালে যুদ্ধের উন্মাদনাকেই বৈধতা দেয়া যায়।

মজার বিষয় হলো, এপ্রিল ও মে মাসে যখন একের পর এক সেনা নিজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে মুক্তি খুঁজছে, তখন সামরিক কর্মকর্তারা অত্যন্ত চতুরতার সাথে একে যুদ্ধের ভয়াবহতা বা গাজায় করা অপরাধবোধ না বলে ‘শোক দিবসের আবেগীয় প্রভাব’ বলে চালিয়ে দিতে চাইছে। তারা প্রচার করে যে, এই সেনারা যুদ্ধের নিষ্ঠুরতায় নয়, বরং মে মাসের এই বিশেষ দিনে মৃত সহযোদ্ধাদের বিরহে কাতর হয়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে আত্মঘাতী হচ্ছেন। যেন এটি কোনো মানসিক রোগ বা পিটিএসডি নয়, বরং দেশপ্রেমের এক চরম ট্র্যাজেডি।

মৃত সেনাদের পরিবারকে সান্ত্বনা দেয়ার বদলে তারা এই শোকের গল্প শুনিয়ে মূল সমস্যাকে ধামাচাপা দেয়। অথচ পর্দার পেছনের সত্যটা হলো- ক্যালেন্ডারের পাতায় শোক দিবস তো একদিন আসে আর যায়, কিন্তু গাজা বা লেবাননে চালানো যে নারকীয় স্মৃতি নিয়ে এই ঘাতক যন্ত্রগুলো বাড়ি ফেরে, সেই বিভীষিকা তাদের জীবনের প্রতিটা মুহূর্তকে একেকটা জীবন্ত শোক দিবসে পরিণত করে। ইসরাইলি রাষ্ট্রযন্ত্র মে মাসের এই শোকের দিনের দোহাই দিয়ে আসলে নিজেদের চরম ব্যর্থতা ঢাকতে চায়। তারা চায় না বিশ্ববাসী জানুক যে, তাদেরই তৈরি ঘাতক যন্ত্রগুলো এখন অনুশোচনা আর আতঙ্কে নিজেদেরই ছিঁড়ে খুঁড়ে খাচ্ছে।

কিন্তু সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজা বা লেবাননের মাটিতে তারা যে নিষ্ঠুরতা আর নৃশংসতার বিষবৃক্ষ রোপণ করেছে, এখন সেই বিষেই নীল হয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি তরুণ সমাজ ও তাদের পরিবারগুলো। মানবিক বিপর্যয়ের এই ঢেউ এখন ঘাতকদের দরজায় কড়া নাড়ছে, যা কোনো অস্ত্র দিয়েই আর ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। জাতিসঙ্ঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার এসব অমানবিকতার পরিণাম নিয়ে সতর্ক করলেও ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ক্ষমতার দম্ভে তা কানে নেয়নি, যার চরম মূল্য এখন দিতে হচ্ছে তাদের নিজেদের সন্তানদের জীবনের বিনিময়ে।


সূত্র: নয়া দিগন্ত