বিশ্ববাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণাও দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সোমবার থেকে অকটেন ২০ এবং পেট্রোল-ডিজেল ১০ শতাংশ হারে বেশি সরবরাহ বাড়ানোর কথা। কিন্তু সরকারি এই ‘কাগুজে’ স্বস্তির বার্তার প্রভাব পড়তে দেখা যায়নি। রাজধানীর পেট্রোলপাম্পগুলোয় দুর্ভোগের চিত্র এখনো আগের মতোই। দীর্ঘ প্রতীক্ষার বিড়ম্বনায় সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস চরমে পৌঁছেছে। সরবরাহ বাড়ার সুফল সাধারণ ভোক্তাদের দোরগোড়ায় এখনো পৌঁছায়নি-এমন কথা বলছেন ভুক্তভোগীরা।

সোমবার রাজধানীর বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন এলাকার ফিলিং স্টেশনগুলোয় সরেজমিন দেখা যায়, যানবাহনের দীর্ঘ সারি। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় পেটে দানাপানি জুটছে না অনেকের। শুধু পানি খেয়েই রোদে পুড়ছেন তারা। গাড়ি রেখে খেতে যাওয়ারও উপায় নেই। যন্ত্রাংশ চুরির ভয়ে চালকের আসন ছেড়ে নামতেও পারছেন না অনেকে। প্রতিটি পাম্পেই এখন একই দৃশ্য। তেল পাওয়ার অনিশ্চয়তা আর ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার এক অসম লড়াই।

পরিবাগ এলাকায় হাজারীবাগ থেকে আসা রাইড শেয়ারিং চালক ফারুক হোসেন বলেন, সকাল ৬টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে ১০টায় তেল পেলাম।

সেদিনের উপার্জন এখন তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। ৫০০ টাকার তেলে কয়টা ট্রিপ দেওয়া যায়?

রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে অপেক্ষমাণ চালকদের মেজাজ এখন খিটখিটে। শাহবাগে অপেক্ষমাণ এক চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার দাম বাড়াল। আমরা মেনে নিলাম। এখন বলছে সরবরাহ বেড়েছে। কিন্তু আমরা তো তেল পাচ্ছি না। তাহলে এই বাড়তি টাকা আর বাড়তি সরবরাহ যাচ্ছে কোথায়?

মিরপুরের কালশী ও ইসিবি চত্বর এলাকায় বৈশাখের ভ্যাপসা গরমে রোদে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অনেককেই অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখা গেছে। কালশীর সুমাত্রা ফিলিং স্টেশনে দুপুরের পর তেল বিক্রি শুরু হলে মুহূর্তেই যানবাহনের সারি দুই কিলোমিটার দীর্ঘ হয়। রোদের তীব্রতা থেকে বাঁচতে চালকদের অনেককে ফুটপাতে বা গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিতে দেখা গেছে।

মতিঝিলের মেঘনা পেট্রোলপাম্পের লাইনে চার ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকা মোটরসাইকেলচালক রাজীব আহমেদ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ১০ বছর ধরে বাইক চালাই, তেলের জন্য এমন কষ্ট জীবনেও দেখিনি। তীব্র গরমে জীবন বের হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। আরেক বাইকার মিনহাজ বলেন, বাইকের তেল শেষ হলে তা সংগ্রহ করা যে কী দুঃসহ যন্ত্রণা, তা বলে বোঝানো যাবে না।

রাজধানীর আসাদ গেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনের সামনে অপেক্ষমাণ মাইক্রোবাসচালক বেলাল হোসেনের গল্পটা শুধু কষ্টের নয়, আতঙ্কেরও। মিরপুর-১৪ থেকে মোহাম্মদপুর পর্যন্ত ঘুরেও তেল না পেয়ে রোববার রাত সাড়ে ১০টায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। সোমবার ভোরে ক্লান্ত শরীরে চোখ লেগে এলে জানালা দিয়ে কিশোর ছিনতাইকারীরা তার মানিব্যাগ নিয়ে চম্পট দেয়। পাশের চালকের সাহসিকতায় মানিব্যাগ উদ্ধার হলেও খোয়া গেছে নগদ কিছু টাকা। বেলাল আক্ষেপ করে বলেন, খাওয়া-ঘুম সব বাদ দিয়ে ১২ ঘণ্টার বেশি লাইনে দাঁড়িয়ে ছিনতাইয়ের শিকার হলাম। এখন তেল পেলাম মাত্র তিন হাজার টাকার। এই সামান্য তেলে গাড়ি চলবে কতক্ষণ? বেলালের মতো শত শত চালক এখন রাজপথে মশার কামড় আর ভ্যাপসা গরমে ধুঁকছেন শুধু কয়েক লিটার জ্বালানির আশায়।

বিপিসির নির্দেশনা অনুযায়ী পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা কোম্পানিকে সরবরাহ বাড়ানোর চিঠি দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন মেলেনি। সোমবার সকালে সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে আসা তেলের লরিতে কোনো বাড়তি সরবরাহ ছিল না। স্টেশনের সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার হৃদয় চন্দ্র দাস বলেন, নতুন লরিতে বাড়তি তেল আসেনি। গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে অকটেনের সরবরাহ যেখানে ৫০-৬০ হাজার লিটার করা দরকার, সেখানে আমরা পাচ্ছি মাত্র ২২ হাজার লিটার।

তালুকদার ফিলিং স্টেশনে টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে ছোট এক টুকরো কাগজ ‘তেল আসবে সন্ধ্যা ৬টার পরে’। পাম্পের ক্যাশিয়ার নূর ইসলাম বিরক্তি নিয়ে বলেন, মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত, তাই লিখে টাঙিয়ে দিয়েছি। সকাল ৭টায়ই তেল শেষ হয়ে গেছে।

বাড়তি সরবরাহ না করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ডিপো থেকে তেল না নিয়েই ফিরে এসেছে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ‘হাসান ফিলিং স্টেশন’-এর একটি ট্যাংক লরি। সোমবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় যমুনা অয়েল কোম্পানির ডিপোতে এ ঘটনা ঘটে। ফিলিং স্টেশনটির মালিক ও পেট্রোলপাম্পের মালিক সমিতির আহ্বায়ক সাজ্জাদুল করিম কাবুল গণমাধ্যমকে ক্ষোভের সঙ্গে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, তার ট্যাংক-লরির ধারণক্ষমতা ১৩ হাজার ৫০০ লিটার। কিন্তু গত তিন দিন ধরে তাকে ৯ হাজার লিটার করে তেল দেওয়া হচ্ছে। সোমবার সরবরাহ বৃদ্ধির ঘোষণা আসার পর তিনি আশা করেছিলেন পর্যাপ্ত তেল পাবেন। কিন্তু ডিপো কর্তৃপক্ষ ওইদিনও সেই আগের মতোই ৯ হাজার লিটার তেল দিতে চাইলে তিনি রাগে ও অভিমানে তেল না নিয়েই ফিরে আসেন।

 

সূত্র: যুগান্তর