মধ্যপ্রাচ্যে, আশিয়ানভুক্ত দেশ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারীদের মধ্যে এক শ্রেণীর প্রবাসী বাংলাদেশী তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে টাকা লেনেদেনে বেশি সক্রিয় রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে ভিসা ট্রেডিংসহ যে সব ব্যবসা করে বৈধ আয়ের অতিরিক্ত ডলার-রিংগিট-ইউরো উর্পাজনের সুযোগ বেশি রয়েছে ওই সব পেশার ব্যবসায়ীরাই নাকি আইনি প্যাচে পড়ার ভয়ে হুন্ডিতে লেনদেন করছে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কুয়েতসহ একাধিক দেশে থাকা প্রবাসীদের সাথে আলাপের পর বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য।
- দেশ থেকেও ভিসার নামে, গাড়ির এলসিসহ নানা নামে টাকা পাচার হচ্ছে
- বিদেশে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে হুন্ডি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার অভিযোগ
মধ্যপ্রাচ্যে, আশিয়ানভুক্ত দেশ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারীদের মধ্যে এক শ্রেণীর প্রবাসী বাংলাদেশী তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে টাকা লেনেদেনে বেশি সক্রিয় রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে ভিসা ট্রেডিংসহ যে সব ব্যবসা করে বৈধ আয়ের অতিরিক্ত ডলার-রিংগিট-ইউরো উর্পাজনের সুযোগ বেশি রয়েছে ওই সব পেশার ব্যবসায়ীরাই নাকি আইনি প্যাচে পড়ার ভয়ে হুন্ডিতে লেনদেন করছে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কুয়েতসহ একাধিক দেশে থাকা প্রবাসীদের সাথে আলাপের পর বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য। শুধু হুন্ডিতে বিদেশ থেকে বিকাশসহ নানা উপায়ে দেশেই টাকা ঢুকছে তা কিন্তু নয়, দেশ থেকেও হুন্ডি সিন্ডিকেটের সদস্যরা নানা কৌশলে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার কোটি টাকা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করছে। আর এসবই হচ্ছে অনেকটা ওপেন সিক্রেটভাবে। এভাবেই দেশ বিদেশে অবস্থানকারী হুন্ডি চক্রের সদস্যরা শত শত কোটি টাকা উপার্জন করছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার দলীয় সাইনবোর্ড ব্যবহার করেই পুরো হুন্ডি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ অনেকের।
মালয়েশিয়ার বুকিত বিনতাং এলাকার একজন পেশাদার সাংবাদিক দু’দিন আগেই এই প্রসঙ্গে নয়া দিগন্তকে বলেন, মালয়েশিয়ায় এখন যারা হুন্ডি চক্র নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাংগিয়ে পুরো সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। প্রভাব বিস্তার করে এখন ওই সদস্য চুটিয়ে ব্যবসাও করছেন। তিনি বলেন, আগে মালয়েশিয়ার কোতারায়া এলাকাটি বাংলাদেশী এলাকা হিসেবে ব্যাপক পরিচিত ছিল। বেশির ভাগ প্রবাসী কোতারায়াকে হুন্ডি এলাকা হিসেবেই চেনেন। এখন সময়ের পরিবর্তনে সবাই সেখান থেকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পুরো মালয়েশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছেন। সবখানেই হুন্ডির থাবা। কারা হুন্ডিতে দেশে বেশি বেশি টাকা পাঠাচ্ছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে ওই সাংবাদিক বলেন, আদম ব্যবসা যারা করেন তারাই মূলত দেশ থেকে টাকা হুন্ডিতে পাঠাচ্ছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যদি আজকের মালয়েশিয়ান রিংগিটের রেট ৩০.৫০ পয়সা হয়, তাহলে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা ব্যাংকিং চ্যানেল থেকে ১০/২০/৩০ পয়সা বেশি নিয়ে দ্রুত পাঠিয়ে দিচ্ছে। এক্ষেত্রে তারা বিকাশের মাধ্যমে দেশে এসব টাকা বেশি লেনদেন সারছে। এখন মালয়েশিয়ায় সমস্ত প্রদেশে হুন্ডি ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, হুন্ডি ব্যবসার জন্য এখন শুধু একটি স্মার্ট মোবাইল ফোনই যথেষ্ট। সরকারি দলের নাম ভাংগিয়ে কারা মালয়েশিয়ায় এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কতজনের নাম বলব? তবে নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে তিনি বলেন, কোতারায়ার ‘এন’ অদ্যাক্ষরের একজন নেতা আছেন, তিনিই এখন পুরো সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে বাজারে ব্যাপক আওয়াজ আছে। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশ কমিউনিটিতে তার নাম হুন্ডির আলোচিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। বিষয়টি বাংলাদেশ হাইকমিশনও কমবেশি অবগত রয়েছে বলে বাংলাদেশ কমিউনিটির কেউ কেউ নাম না প্রকাশের শর্তে জানিয়েছেন।
শুধু মালয়েশিয়া নয়, সিংগাপুরেও দেদারসে চলছে হুন্ডির রমরমা ব্যবসা। কারা এসব ব্যবসা করছে তা আমাদের বাংলাদেশ হাইকমিশন ও দেশে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও অজানা থাকার কথা নয়। তবে তারা রহস্যজনকভাবে নীরব হয়ে আছেন বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ। যার কারণে দেশ থেকে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার কোটি টাকা স্টুডেন্টদের নামে, ভিসা কেনাবেচার নামে, গাড়ির এলসির টাকা ব্যবসার নামে, স্বর্ণ ব্যবসার নামে আবার কখনো সবজি ব্যবসার নামেও হুন্ডিতে টাকা লেনদেন চলছে দেদারসে।
গত সপ্তাহে রাজধানীর নয়া পল্টনের একটি গাড়ির শোরুমের মালিকের সাথে কথা বলতে গেলে ওই মালিক বলেন, ‘একটি গাড়ির বিপরীতে এলসির জন্য যতটাকা জাপানে পাঠানোর কথা সেই টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো সম্ভব নয়। আমরা অধিকাংশ সময় হুন্ডিতে অতিরিক্ত টাকা পাঠিয়ে থাকি। এটা আমি নয় অন্য গাড়ির ব্যবসায়ীরাও একইভাবে টাকা পাঠাচ্ছে।’ গত সপ্তাহে কুয়েত থেকে একজন প্রত্যক্ষদর্শী নয়া দিগন্তকে বলেন, হুন্ডি তো সমানতালে চলছেই। এটা বন্ধ হওয়ার সুযোগ নাই। আর এখানে যাদের (দূতাবাস) এসব বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা তারা কিছুদিন ক্যাম্পেইন করেছিলেন। এখন আর তাদের খবর নাই। শুধু এখানে নয়, বাংলাদেশ থেকেও হুন্ডিতে কারা কোটি কোটি টাকা প্রতিদিন লেনদেন করছেন তার সব খবরই আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাইদের অজানা থাকার কথা নয়। আবার ব্যাংকিং সেক্টরে কারা এসব হুন্ডিতে জড়িত সেটিও তারা কমবেশি জানেন। কিন্তু তারপরও কি হুন্ডি চক্রের সদস্যদের উৎপাত কমছে। কমেনি। কমবেও না। কারণ এটা কাঁচা টাকা। আর কাঁচা টাকার ভাগ পায় সবাই। আবার সরকার যদি ইচ্ছা করে তাহলে এটা পুরোপুরি বন্ধ না হলেও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু সরকারের সদিচ্ছা আছে সেটা আমরা তাদের কাজকর্মে কোনোভাবেই দেখতে পারছি না। এক প্রশ্নের উত্তরে ওই ব্যক্তি বলেন, হুন্ডির মাধ্যমে মূলত যারা দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন তাদের একটি অংশই কুয়েত সরকার নির্ধারিত ইনকামের টাকার অতিরিক্ত ইনকাম টাকাই পাঠাচ্ছে। কারণ ওই টাকার বাইরে তাদের যে টাকা আয় হচ্ছে সেটি ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠাতে গেলে তারা ধরা খেয়ে যাবেন। যার কারণে তারা ওই বাড়তি আয়ের টাকা হুন্ডিতে পাঠান। এ ছাড়াও কুয়েতে প্রবাসী কর্মীদের প্রলোভন এবং নিরাপদে দেশে দ্রুত টাকা পৌঁছে দেয়ার সিন্ডিকেট আগেও ছিল এখনো সেটি সক্রিয় আছে। তারা ঠিকই প্রতি মাসের টাকা কালেকশন করে হুন্ডি করছে। এতে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে টাকা যাচ্ছে কম। তবে গড়ে শতকরা ৪০% টাকা এখনো হুন্ডিতেই যাচ্ছে। সরকারের পক্ষে কাজ করার জন্য এখানে যারা আছেন তাদের আরো শক্তভাবে এই বিষয়টি দেখা উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, দূতাবাসে যারা আসছেন তাদের সকল সুবিধা দিচ্ছে সরকার শুধু এসব অনিয়ম দেখার জন্য। কিন্তু তারা কি সেই কাজটি ঠিক মতো করছেন বিদেশের মাটিতে বসে?
সূত্র: নয়া দিগন্ত