কুষ্টিয়া থেকে আসা হামে আক্রান্ত আট মাস বয়সী শিশু ইরফান আহমেদ ঢাকার ডিএনসিসি হাসপাতালে পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। গত বৃহস্পতিবার তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হলেও আজ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ইরফানের মৃত্যুতে স্বজনদের আহাজারি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র থেকে পাঠানো হামের তথ্যে গরমিল দেখা যাচ্ছে। গতকাল সোমবারসহ একাধিক দিনে ভুল তথ্য ঠিক করারও নজির রয়েছে।
সাধারণত দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ের (বেলা সাড়ে তিনটা থেকে বিকেল পাঁচটা) মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে পাঠায়। কিন্তু গতকাল তারা হামের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে বিলম্বে—রাত আটটায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম–সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য দেড় মাস ধরে ভুল ছিল। গতকাল তা ধরা পড়েছে। সেই তথ্য সমন্বয় করার জন্য সংবাদ বিজ্ঞপ্তি তৈরি করতে বিলম্ব হয়েছে।
পরশুর সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ছিল, রাজশাহী বিভাগে অদ্যাবধি মোট হামের রোগীর সংখ্যা ৯ হাজার ৪১৪। গতকালের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাজশাহী বিভাগে অদ্যাবধি মোট হামের রোগীর সংখ্যা ৫ হাজার ১৫৯, অর্থাৎ আগে ৪ হাজারের মতো রোগী বেশি দেখানো হচ্ছিল। এর কারণ ব্যাখ্যায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংখ্যাগত পুনরাবৃত্তি (ডুপ্লিকেশন) ঘটার কারণে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ও সন্দেহজনক হামের রোগীর সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা সংশোধনপূর্বক সমন্বয় করা হলো।
এর ফলে দেশের হামের উপসর্গ আছে—এমন মোট রোগীর সংখ্যাও কমেছে। আগে এমন মোট রোগী ছিল ৫৭ হাজার ৮৪৬। গতকালের সংখ্যা ৫৪ হাজার ৯১১।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. জাহিদ রায়হান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ঘটনা যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি। আগের ঘটনাগুলো কেন ঘটেছে, সেটাও জানার চেষ্টা করছি।’
প্রাদুর্ভাবের সময় মানুষ ঠিক তথ্য পেতে চায়। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলেন, ঠিক সময় ঠিক তথ্য টিকার মতো কাজ করে। তথ্য ঠিক না থাকলে মানুষ বিভ্রান্ত হয়। বিভ্রান্ত মানুষ টিকা নিতে দ্বিধাবোধ করে। চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে যেতে যায় না।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে–নজীর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, কোনো প্রাদুর্ভাব, দুর্যোগ বা মহামারির সময় সরকারের পক্ষ থেকে নিয়মিত তথ্য দেওয়া হয় ‘রিস্ক কমিউনিকেশন’–এর অংশ হিসেবে। সরকারের এ তথ্য হতে হয় বস্তুনিষ্ঠ, পরিষ্কার, সহজ। মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য এ তথ্য দেওয়া হয়। মানুষের কাছে সরকারের এ তথ্য নিয়মিত পৌঁছে দেয় সংবাদমাধ্যম বা গণমাধ্যম। এতে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা মানুষের জন্য সহজ হয়। মানুষ জেনেবুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কিছু করার ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততা আসে।
ঘটনা নতুন নয়
ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নির্দিষ্ট কাঠামোতে তথ্য দিত। এখনো তা অব্যাহত আছে। করোনা মহামারির সময়ও নির্দিষ্ট কাঠামোতে তথ্য দেওয়া হতো। সেই তথ্যকাঠামো এখনো আছে। কিন্তু শুরু থেকে হামের তথ্যকাঠামো বারবার বদল করা হচ্ছে। যেমন বিভাগওয়ারি তথ্যের জন্য আগে (৩ এপ্রিল ২০২৬) স্তম্ভ (কলাম) ছিল ৬টি, এখন ১২টি। এ রকম ছোট ছোট পরিবর্তন প্রায়ই হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ণ প্রস্তুতি না নেওয়া এবং পরিস্থিতি অনুধাবন করতে না পারার কারণে এমন হচ্ছে।
একটি বড় পরিবর্তন দেখা যায় ১০ মের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে। এদিন হামের উপসর্গ নিয়ে এযাবৎ ৩৪৪ জন এবং নিশ্চিত হামে ৬৫ শিশুর মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হয়। মোট মৃত্যু ছিল ৪০৯। এক দিন আগে মোট মৃত্যু ছিল ৩৫২।
এক দিনের ব্যবধানে হামের উপসর্গ নিয়ে ও হামে ৫৭ জনের মৃত্যু ছিল অস্বাভাবিক। বাস্তবে ১০ মের আগে মৃত্যুর সংখ্যা কম দেখানো হচ্ছিল। এদিন অধিদপ্তর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিল, ময়মনসিংহ, রংপুর ও শের–ই–বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মৃত্যুর তথ্য ও সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জনের তথ্য সমন্বয় করে নতুন তথ্য দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরও মুদ্রণত্রুটির কথা তাতে বলা হয়।
কিছু ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে তথ্যই দেওয়া হচ্ছে না। যেমন ১৬ মের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিকার কোনো তথ্যই ছিল না।
জনস্বাস্থ্যবিদ বে–নজীর আহমেদ বলেন, কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গুর প্রকোপ চলছে। এর মধ্য কোভিড মহামারি হয়ে গেল। এখন হামের প্রাদুর্ভাব চলছে। কিন্তু তথ্যের জন্য এখনো কোনো স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলা হলো না, এটা সত্যি দুঃখজনক।
সূত্র: প্রথম আলো