আমরা অনেক সময় সুখকে এমন কিছু মনে করি, যেন সুখ এটা একটি লক্ষ্য, যা অর্জন করতে হয়। কিন্তু ষাটের পরে অনেক মানুষ বুঝতে শুরু করেন, সুখ আদতে কোনো লক্ষ্য নয়। সাধারণ জীবনটাই মূল্যবান।
আমার বড় খালার বয়স ৬৩ বছর। চার বছর হলো খালু মারা গেছেন। খালার ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠিত। সারা জীবনের সব দায়িত্ব পালন শেষে খালা একরকম অবসরে।
শীতের শুরুতে ঘুরে এলাম ঝিনাইদহের শৈলকুপায় বড় খালার বাসা থেকে। ঘরবাড়ি গোছানো, টিপটপ। পুত্রবধূর ম্যাক্সির জন্য একটা কুরুশের নকশা বুনছেন।
আমার তিন বছরের কন্যার ফ্রকের জন্যও একটা কুরুশে বোনা গলার নকশা উপহার দিলেন। আমরা বেড়াতে যাব শুনে আগেই বানিয়ে রেখেছেন।
চোখে চশমা এঁটে এই বয়সেও একটা নকশিকাঁথা সেলাই করছেন। বারান্দার টবে ধনিয়া, পুদিনা, কয়েক জাতের মরিচসহ আরও কয়েকটি গাছ লাগিয়েছেন। বাসার সামনে একটুখানি জায়গায় লাউ, কুমড়া, করলার মাচা। টমেটো আর কয়েক প্রকার শাকও আছে সেখানে।
খালা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, পাশের বাসার একটা তরুণীর সঙ্গে ফজরের নামাজ শেষে নিয়মিত হাঁটেন। সন্ধ্যায় সেই মেয়েটিই এসে খালার চুলে তেল দিয়ে দেয়। টুকিটাকি কাজে সাহায্য করে। গল্প করে। আমরা ফিরে আসার সময় বড় এক ডিব্বা নাড়ু বানিয়ে দিলেন। মুখে ‘এই তো আছি’ বললেও, দেখে মনে হলো, বেশ আছেন।
ভিড় এড়িয়ে মাথা ঠান্ডা করে ঈদের কেনাকাটা করার জন্য আমি সাধারণত রোজার শুরুতেই ঈদ শপিং সেরে ফেলি। এবারও ঈদের কেনাকাটা করতে গিয়ে এক দম্পতির সঙ্গে দেখা। তাঁদের বয়স ৬৫ থেকে ৭৫–এর মধ্যে হবে।
কানাডা থেকে একমাত্র ছোট মেয়ে, জামাই আর দুই নাতনির আসার কথা। তাই এবারের ঈদটা এই দম্পতির জন্য আলাদা।
আমার মেয়েকে দেখে বললেন, ‘আমার ছোট নাতনির বয়স তোমার মেয়ের মতোই, এপ্রিলে ৩ হবে। ওর জন্মদিনটা এবার আমাদের বাড়িতেই হবে। জানো, এবারই প্রথম আমাদের সামনাসামনি দেখা হবে।’
যশোরের স্থানীয় লোকশিল্পের নামকরা দোকান থেকে দুই নাতনির জন্য একই রকম দুই জোড়া ফ্রক নিলেন। মেয়েকে উপহার দেওয়ার জন্য নিলেন হাতের কাজের লেস বসানো পর্দা। আরও নানা কিছু অর্ডার দিলেন।
দুজন প্রবীণ ব্যক্তি ঘুরে ঘুরে নানা কিছু দেখছিলেন আর এটা–ওটা জিজ্ঞেস করছিলেন। তিনি জানালেন, কফির বিরতি নিয়ে সুপারশপে ঢুঁ মারবেন। সপ্তাহখানেক ধরে দুজন মিলে যশোর চষে বেড়িয়ে নানা কিছু কেনাকাটা করছেন রান্না করে খাওয়াবেন বলে।
কোন দিন কী রান্না করবেন, কোথায় কোথায় বেড়াতে যাবেন, তারও একটা তালিকা করেছেন। দেখে মনে হলো, প্রবীণ এই দম্পতির দুজনের ভেতরে কোনো দ্বিধা নেই, চাপ নেই।
দুই ছেলে ঢাকায় আর একমাত্র মেয়ে কানাডা থাকেন। ছেলেমেয়েরা তাঁদের সঙ্গে থাকতে বলেন। কিন্তু এই দুজন জানান, তাঁদের নিজেদের মতো করে পুরোনো বাড়িতে থাকতেই ভালো লাগে। ফলে দিনের একটা বড় অংশ কাটে ভিডিও কলে।
কারও প্রতি তেমন প্রত্যাশা নেই। যে যেমন আছে, তাতেই তাঁরা সুখী। দেখলাম, দুজন মিলে ছোট ছোট সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। শখ পূরণ করছেন আর সন্তুষ্ট থাকছেন।
সুখী হওয়ার দৌড়ে আমরা ক্লান্ত হয়ে যাই
আমরা অনেক সময় সুখকে এমন কিছু মনে করি, যেন সুখ এটা একটি লক্ষ্য, যা অর্জন করতে হয়। কিন্তু ষাটের পরে অনেক মানুষ বুঝতে শুরু করেন, সুখ আদতে কোনো লক্ষ্য নয়। সাধারণ জীবনটাই মূল্যবান। স্লো লিভিং, ধীরে ধীরে শান্তভাবে ছোট ছোট কাজ উপভোগ করার ভেতরেও সুখ থাকে।
অনেকেই সারা জীবন মনে করেন, ‘চাকরিতে পদোন্নতি পেলে সুখী হব’ বা ‘নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমলে, বাড়ি বা গাড়ি কিনলে সুখী হব’। এই ধারণার সমস্যা হলো, সুখকে লক্ষ্য বানালে সেই দৌড় কখনো শেষ হয় না। লক্ষ্যের দূরত্ব প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে। আর আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপিয়ে উঠি।
কখনো কখনো কিছু না করাও আনন্দের
অনেক প্রবীণ ব্যক্তি বুঝতে পারেন, সব সময় ব্যস্ত থাকা জরুরি নয়। সকালে জানালার পাশে বসে পাখি দেখা, ধীরে ধীরে এক কাপ চা খাওয়া, প্রতিবেশীদের সঙ্গে টুকটাক গল্প—এসব খুব সাধারণ কাজ। কিন্তু এসবই অনেক সময় গভীর তৃপ্তির উৎস।
গবেষণাও বলছে, সুখকে লক্ষ্য করার চেয়ে জীবনকে স্বাভাবিকভাবে উপভোগ করা মানসিক সুস্থতার জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।
সূত্র: প্রথম আলো