ঈদের আনন্দময় স্মৃতির সঙ্গে নব্বইয়ের দশক থেকে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’। সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, দর্শকের অভ্যাসও পাল্টেছে; তবু ঈদ এলেই দর্শকদের প্রত্যাশার তালিকায় এখনো শীর্ষের দিকেই থাকে এই অনুষ্ঠান। সেই ‘ইত্যাদি’র নির্মাতা হানিফ সংকেত—যিনি শুধু জনপ্রিয় উপস্থাপকই নন, ব্যঙ্গ–রসের আড়ালে সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরা এক সচেতন নির্মাতা ও লেখকও—এবার পাচ্ছেন স্বাধীনতা পুরস্কার। এই উপলক্ষে মিরপুরে তাঁর অফিসে তাঁকে অভিনন্দন জানাতে গিয়েছিলেন মাসুম অপু
বিকেলের আলো তখন মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামের পেছনের এলাকাটিতে নরম হয়ে এসেছে। সেই আলো পেরিয়ে ঢুকলাম ফাগুন অডিও ভিশনের ভবনে। এখানেই বছরের পর বছর তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’। বাইরে থেকে ভবনটি খুব সাধারণ মনে হলেও ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়—এখানে বছরের পর বছর ধরে তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসের বহু স্মরণীয় মুহূর্ত।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সেখানে দেখা হলো অনুষ্ঠানটির নির্মাতা ও উপস্থাপক এ কে এম হানিফের সঙ্গে, যিনি দর্শকের কাছে পরিচিত হানিফ সংকেত নামে। শুরুতেই শুভেচ্ছা জানালাম। কিছুদিন আগেই রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা হয়েছে—সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬ পাচ্ছেন তিনি। কুশল বিনিময়ের পর শুরুতে জানতে চাইলাম, খবরটি প্রথম কখন জানতে পেরেছিলেন। উত্তরে হানিফ সংকেত বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার প্রায় আধা ঘণ্টা আগে বিষয়টি জানতে পারি। স্বাভাবিকভাবেই ভালো লেগেছিল। প্রথমে স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছি। তবে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছি যখন দেখলাম সংস্কৃতিকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শক—সবাই এই প্রাপ্তিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন।’
চার দশকের বেশি সময়ের পথচলার শেষে এই স্বীকৃতিকে তিনি দেখছেন নতুন দায়িত্বের প্রেরণা হিসেবে। তাঁর ভাষ্যে, ‘আমি কখনো প্রাপ্তি–অপ্রাপ্তি নিয়ে খুব বেশি ভাবিনি। চেষ্টা করেছি কাজের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ের কাছে পৌঁছাতে। মানুষের ভালোবাসাই ছিল আমার কাছে বড় পুরস্কার। তবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এই সম্মান অবশ্যই আনন্দের।’
ইত্যাদির কারখানা
পুরো ভবনটা ঘুরে দেখলাম। সব ফ্লোরে চোখে পড়ে একধরনের শৃঙ্খলা ও যত্নের ছাপ। ছিমছাম সাজানো। ভবনের কয়েকটি ঘরজুড়ে শুধু শিল্পীদের কস্টিউম। ‘ইত্যাদি’ কিংবা হানিফ সংকেতের অন্য অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় পোশাক এখান থেকেই তৈরি ও সংরক্ষণ করা হয়। আরেকটি কক্ষে সারি সারি সাজানো তাঁর ব্যবহৃত অসংখ্য স্যুট—যেন এক সংগ্রহশালা। হানিফ সংকেত জানালেন, ‘ইত্যাদির প্রায় প্রতিটি পর্বের জন্য নতুন স্যুট বানাতে হয়। তবে তার জন্য কোনো স্পনসর নেই। শুধু আমার নয়, “ইত্যাদি” বা আমার নাটকের শিল্পীদের কস্টিউমেও আমরা স্পনসর নিই না।’ একটু থেমে বললেন, ‘কোয়ালিটির বিষয়ে আমি কোনো ছাড় দিই না।’ এই আপসহীনতার উদাহরণও দিলেন। কখনো কখনো খুব কাছের মানুষকেও ছাড় দেননি তিনি। মনে হয়েছে, ‘ইত্যাদি’র জন্য কেউ উপযুক্ত নন—তাহলে তাঁকে নেননি।
আড্ডার ফাঁকে ‘ইত্যাদি’ তৈরির প্রস্তুতির কথাও জানালেন। একটি পর্ব তৈরির পেছনে যে কতটা গবেষণা, পরিকল্পনা ও শ্রম থাকে, তা শুনলে বোঝা যায় কেন অনুষ্ঠানটি এত বছর ধরে দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখতে পেরেছে। ‘আমরা যখন কোনো জেলায় অনুষ্ঠান করি, তার আগে অনেক প্রস্তুতি থাকে। প্রথমে বই পড়ি, গুগলে ওই এলাকার তথ্য দেখি। তারপর প্রতিনিধি পাঠাই। পরে নিজে গিয়ে জায়গাটা দেখি। তারপর আয়োজনের পরিকল্পনা করি।’
স্টুডিওর চার দেয়াল ছেড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্তই ‘ইত্যাদি’র অন্যতম বড় স্বকীয়তা। একটি জেলার ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, মানুষের জীবন—সব মিলিয়ে প্রতিটি পর্ব হয়ে ওঠে আলাদা। দেশের প্রান্তে প্রান্তে ছুটে গিয়ে ‘ইত্যাদি’ যেমন তুলে এনেছে নানা অঞ্চল, ঐতিহ্য, লোকজ বৈচিত্র্য ও অভূতপূর্ব বিষয়, তেমনি তুলে এনেছে অসংখ্য নতুন প্রতিভাকেও। এই দিক থেকে ‘ইত্যাদি’ শুধু বিনোদনের অনুষ্ঠান নয়, এক অর্থে সময়ের দলিলও।
অফিসের একটি কক্ষে ঢুকতেই চোখে পড়ে বইয়ের সারি। ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ—নানা বিষয়ে শত শত বই। যেন নীরবে সাক্ষ্য দিচ্ছে এই অনুষ্ঠানের পেছনের প্রস্তুতির গল্প। হানিফ সংকেত বললেন, ‘নিজেকে সমৃদ্ধ করার জন্য পড়তে হয়। শব্দভান্ডার বাড়ানোর জন্যও পড়া জরুরি। প্রতিদিন কোনো না কোনো বই পড়ার চেষ্টা করি।’ এই পড়াশোনাই তাঁর উপস্থাপনার ভাষা ও ভাবনাকে সমৃদ্ধ করেছে।
অফিসের করিডরে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে দেয়ালে টাঙানো একটি ছবি—টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ফজলে লোহানীর ছবি। ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানের সেই স্মৃতি। এই অনুষ্ঠান থেকেই প্রথম টেলিভিশনে উপস্থিত হন হানিফ সংকেত। ফজলে লোহানীর কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে আজও কৃতজ্ঞতার সুর। তিনি বলেন, ‘ফজলে লোহানী ছিলেন একজন লেখক, সাংবাদিক ও উপস্থাপক—একজন উদার হৃদয়ের আধুনিক মানুষ। দীর্ঘদিনের পথচলায় তিনি আমার বন্ধু এবং অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন।’
দর্শকই শেষ কথা
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ‘ইত্যাদি’ দেখছে। কেন মানুষ অনুষ্ঠানটি এত পছন্দ করে—এই প্রশ্নে তাঁর উত্তর সরল। ‘এই অনুষ্ঠানের প্রতি আমার ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা, একাগ্রতা ও আন্তরিকতাই এর শক্তি। ব্যস্ততম জীবনের মধ্যেও দর্শক সময় বের করে ইত্যাদি দেখেন—এটাই আমার পরম পাওয়া।’ তাঁর মতে, একটি অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় শক্তি দর্শক। দর্শকরা তাঁদের মূল্যবান সময় বের করে অনুষ্ঠান দেখতে বসেন। তাই সেই সময়ের মূল্য দেওয়া নির্মাতাদের দায়িত্ব। ‘আমার কাছে দর্শকের রায়ই চূড়ান্ত। দর্শকদের সমর্থন, সহযোগিতা ও ভালোবাসার কারণেই “ইত্যাদি”-র এই দীর্ঘ পথচলা সম্ভব হয়েছে।’ বললেন হানিফ সংকেত। যোগ করলেন, ‘আমার নিজস্ব বড় প্রোডাকশন আছে। চাইলে প্রতি সপ্তাহে অনুষ্ঠান করতে পারি। কিন্তু আমি সংখ্যার চেয়ে মানকে গুরুত্ব দিই।’
হানিফ সংকেতের এই দৃষ্টিভঙ্গিই সম্ভবত ‘ইত্যাদি’কে অন্য অনেক অনুষ্ঠানের ভিড় থেকে আলাদা করেছে। তথ্য, রম্যরস, ব্যঙ্গ, সামাজিক বার্তা, দেশজ সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে এটি এমন এক ফরম্যাট, যা একই সঙ্গে বিনোদন দেয়, ভাবায়, আবার স্মৃতিতেও জায়গা করে নেয়।
বর্তমান সময়ের বিনোদন জগতে ‘ভাইরাল’ হওয়ার প্রবণতা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ‘চমক’ ও ‘ভাইরাল’—এই জাতীয় শব্দগুলো তিনি খুব একটা পছন্দ করেন না। ‘চমক অনেকটা ভাইরাল ধরনের বিষয়। আজকাল অধিকাংশ কনটেন্টের বেলায় এই শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়। তাই “ইত্যাদি”-র সঙ্গে এগুলো যুক্ত করতে চাই না। আমি চমকে নয়, মান ও বিষয়বৈচিত্র্যে বিশ্বাসী।’ হানিফ সংকেত আরও যোগ করলেন ‘এখন অনেক সময় গভীর বা জীবনমুখী সৃষ্টির চেয়ে ভাইরাল হওয়ার তাড়না বেশি দেখা যায়। এতে স্থূল কৌতুক বা সাময়িক উত্তেজনার বিষয় গুরুত্ব পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ক্ষতি করতে পারে।’
কিন্তু ভাইরালের পাশাপাশি এখন ‘ভিউ’-এর হিসাবও যেন বিনোদন অঙ্গনের বড় মানদণ্ড হয়ে উঠেছে। এই ‘ভিউ–সংস্কৃতি’ কি ‘ইত্যাদি’র মতো দীর্ঘদিনের একটি অনুষ্ঠানের জন্য কোনো উদ্বেগের বিষয়? দ্বিধাহীন কণ্ঠেই উত্তর দিলেন হানিফ সংকেত, ‘ভিউ মানেই কিন্তু মান নয়। চটুল কিছু দিয়ে সাময়িক শোরগোল তোলা সহজ, কিন্তু মানুষের মনে স্থায়ী হয় না। “ইত্যাদি”-র দর্শক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের চেয়ে হৃদয়ের প্ল্যাটফর্মে বেশি। আমরা যখন কোনো সামাজিক সমস্যার সমাধান নিয়ে প্রতিবেদন করি এবং সেই প্রতিবেদন দেখে কোনো মানুষের জীবন বদলে যায়, সেটাই আমাদের কাছে আসল সাফল্য। আমরা “লাইক-কমেন্ট” গণনার চেয়ে মানুষের ভালোবাসাকেই বেশি গুরুত্ব দিই।’
সব মিলিয়ে স্বাধীনতা পদক পাওয়ার পরও হানিফ সংকেত এটিকে শেষ নয়, বরং নতুন শুরুর প্রেরণা হিসেবে দেখছেন। ‘আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও লোকজ উপাদানগুলোকে আধুনিক প্রজন্মের কাছে আরও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরতে চাই। বিশেষ করে ডিজিটাল মাধ্যমে যাতে সুস্থ সংস্কৃতি টিকে থাকে, সেদিকে নজর দিতে চাই।’ নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন কনটেন্ট নির্মাণে যুক্ত হচ্ছেন। প্রযুক্তির কল্যাণে এখন যে কেউ কনটেন্ট তৈরি করতে পারছেন। এটি যেমন প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি মানহীন কনটেন্টও বাড়িয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে মননশীলতার ঘাটতি দেখা যায়। শিল্প ও সংস্কৃতি কেবল ব্যবসা নয়—এটি দায়িত্বের জায়গা। আমরা প্রযুক্তিতে আধুনিক, কিন্তু আদর্শে চিরন্তন থাকতে চাই। যন্ত্র যেন মানুষের মেধা আর সৃজনশীলতাকে ছাপিয়ে না যায়, সেটাই লক্ষ রাখা জরুরি।’
এবারের ঈদ ও ঈদের ‘ইত্যাদি’
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ঈদের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে আছে ‘ইত্যাদি’। ঈদের পর্ব নিয়ে দর্শকদের প্রত্যাশাও থাকে বরাবরই বেশি। হানিফ সংকেত বললেন, ‘ঈদের অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বড় চাপ হচ্ছে বিদেশি পর্ব। বিদেশি নির্বাচনের কাজ শুরু হয় রোজা শুরুর অন্তত তিন মাস আগে থেকে। এরপর প্রায় দেড় মাস মহড়া চলে।’
তারপরও এবারের ঈদের ‘ইত্যাদি’ নিয়ে দর্শকদের কৌতূহল থাকবেই।
হানিফ সংকেত জানালেন, এবারের আয়োজনেও থাকবে নাচ–গান–অভিনয়ে সমৃদ্ধ বর্ণাঢ্য পরিবেশনা। দেশের শীর্ষ তারকারা অংশ নিচ্ছেন। মানুষকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে সবশেষে থাকবে দেশের গান। পাশাপাশি এবার ফাগুন অডিও ভিশনের ব্যানারে থাকছে নাটকও। এবারের নাটকের নাম ছন্দময়—‘ভালোবেসে অবশেষে’। এতে থাকবে বিনোদনের পাশাপাশি সামাজিক বার্তা ও দেশের কথা।
ঈদের আগে ব্যস্ততা থাকে অনুষ্ঠান প্রস্তুতিতে। তবে ঈদের দিন হানিফ সংকেত পরিবার ও দর্শকদের সঙ্গেই সময় কাটাতে পছন্দ করেন। ‘ঈদের দিন পরিবারের সবাইকে নিয়ে সারা দেশের দর্শকদের সঙ্গে ‘ইত্যাদি’ দেখি। শুধু ঈদেই নয়—প্রতিটি পর্বই আমি আমার দর্শকদের সঙ্গে দেখার চেষ্টা করি।’
চার দশক ধরে টেলিভিশনের পর্দায় সুস্থ বিনোদন, ব্যঙ্গ ও সামাজিক সচেতনতার এক অনন্য মিশ্রণ তৈরি করেছেন হানিফ সংকেত। স্বাধীনতা পদক ২০২৬ সেই দীর্ঘ পথচলারই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। এত বছর একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার উদহারণ খুব কম, বাংলাদেশে নেই। এ প্রসঙ্গে বরেণ্য এ নির্মাতা ও উপস্থাপক বললেন, ‘“ইত্যাদি” হলো একটা পারিবারিক মিলনমেলা। প্রযুক্তির ভিড়ে মানুষ অনেক কিছু হারাচ্ছে, কিন্তু হারানো সেই পারিবারিক বন্ধনটা “ইত্যাদি”-র স্বল্প সময়ের আয়োজনে ফিরে আসে বলেই হয়তো দর্শক আজও আমাদের ভালোবাসেন।’
সূত্র: প্রথম আলো