শীত বা গরম, সব মৌসুমেই পারফিউম ব্যবহার করেন অনেকেই। কেউ জামায়, কেউ গায়ে স্প্রে করেন এই পারফিউম। তবে এই তফাতটা আসলে পারফিউমের ধরনের ওপর নির্ভর করে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গলায় পারফিউম ব্যবহারের অভ্যাস নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে।
কয়েকটি সতর্কতামূলক পোস্ট থেকে শুরু হয়ে বিষয়টি এখন বড় বিতর্কে রূপ নিয়েছে।
কেউ বলছেন ত্বকের ক্ষতি হয়, কেউ বলছেন হরমোনের সমস্যা পর্যন্ত হতে পারে। তাহলে আসলে সত্যিটা কী? চলুন, তা জেনে নিই আজকের প্রতিবেদনে।
কেন গলায় পারফিউম ব্যবহার না করতে বলা হয়
অনেক ব্যবহারকারীর দাবি, গলার ঠিক নিচেই থাকে থাইরয়েড গ্রন্থি, যা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে।
এই অংশের ত্বক তুলনামূলক পাতলা ও রক্তনালিতে সমৃদ্ধ হওয়ায়। বারবার কৃত্রিম সুগন্ধি লাগালে রাসায়নিক উপাদান ত্বকের ভেতরে বেশি শোষিত হতে পারে—এমন আশঙ্কা তারা তুলেছেন।
কেউ কেউ বলছেন, আধুনিক পারফিউম শুধু ওপরের স্তরে সুগন্ধ ছড়ায় না; এতে ফ্যাথালেট, সলভেন্ট ও ফিক্সেটিভের মতো উপাদান থাকে, যা ত্বকের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে এবং দীর্ঘক্ষণ গন্ধ টিকিয়ে রাখে।
আবার কেউ কেউ বলছেন, নিয়মিত গলায় পারফিউম ব্যবহার করলে অকারণ ক্লান্তি, উদ্বেগ, মুড সুইং, গলার ত্বকে জ্বালা, সুগন্ধি থেকে মাথাব্যথা, এমনকি হরমোনের ভারসাম্যহীনতাও হতে পারে।
যদিও এসব দাবির বেশির ভাগেরই শক্ত চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, তবুও এত মানুষের অভিজ্ঞতা শেয়ার হওয়ায় কৌতূহল ও উদ্বেগ দুটিই বেড়েছে।
চিকিৎসকরা কী বলছেন
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল সমস্যা হরমোন নয়। বরং ত্বকের গঠন ও পারফিউমের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মীনু মালিক জানান, বাজারের বেশিরভাগ পারফিউমে উচ্চমাত্রার অ্যালকোহল, কৃত্রিম সুগন্ধি রাসায়নিক ও প্রিজারভেটিভ থাকে। এগুলো দ্রুত উড়ে গিয়ে গন্ধ ছড়ানোর জন্য তৈরি হলেও, এই উচ্চ উড়নশীলতা ত্বকের সুরক্ষা স্তর দুর্বল করতে পারে—বিশেষ করে পাতলা ত্বকে।
গলায় বারবার পারফিউম লাগালে ধীরে ধীরে জ্বালা, লালচে ভাব, চুলকানি, র্যাশ এমনকি সময়ের সঙ্গে ত্বকের রঙের পরিবর্তনও হতে পারে।
তিনি আরো বলেন, কিছু সুগন্ধি উপাদান সূর্যালোকে সংবেদনশীলতা বাড়ায়। রোদে বের হলে এসব উপাদান ত্বকে প্রতিক্রিয়া করে ফাইটোফোটোডার্মাটাইটিস নামের সমস্যা তৈরি করতে পারে। এর ফলে ত্বকে গাঢ় দাগ পড়তে পারে, যা সেরে যেতে সপ্তাহ লেগে যায়।
গলার ত্বক পাতলা, নড়াচড়া বেশি হয় এবং সবসময় খোলা থাকে। এসব কারণে এই অংশ বেশি সংবেদনশীল। মাঝে মাঝে ব্যবহার বড় সমস্যা না করলেও নিয়মিত ব্যবহার করলে দেরিতে হওয়া অ্যালার্জি ও দীর্ঘস্থায়ী জ্বালার ঝুঁকি বাড়ে।
পারফিউম কি হরমোন বা থাইরয়েডে প্রভাব ফেলে?
অনলাইনে ছড়ানো দাবিগুলো নিয়ে চিকিৎসকরা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. প্রিয়া পুজা জানান, গলায় পারফিউম লাগানো বিষক্রিয়ার মতো সরাসরি বিপজ্জনক নয়, তবে এই জায়গাটি সংবেদনশীল হওয়ায় সাবধানতা প্রয়োজন। গলার ত্বক শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় বেশি শোষণক্ষম, তাই অ্যালকোহল, সুগন্ধি রাসায়নিক ও প্রিজারভেটিভ সহজে ভেতরে ঢুকতে পারে।
বারবার ব্যবহার করলে ত্বকের সুরক্ষা স্তর দুর্বল হয়ে কনট্যাক্ট ডার্মাটাইটিস হতে পারে। বিশেষ করে যাদের একজিমা বা রোসেশিয়া আছে, তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বার্গামট বা সাইট্রাস জাতীয় উপাদান রোদে ত্বকের সঙ্গে বিক্রিয়া করে স্থায়ী দাগও ফেলতে পারে।
হরমোনের বিষয়ে তিনি বলেন, শরীরে রাসায়নিক জমা হওয়ার তাত্ত্বিক আলোচনা থাকলেও মাঝেমধ্যে অল্প পরিমাণ পারফিউম ব্যবহারে হরমোনের বড় ধরনের ক্ষতি হয়—এমন প্রমাণ নেই। তবে গলায় নিয়মিত ব্যবহার করলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এক্সপোজার বাড়ে, অথচ এতে বাড়তি কোনো সৌন্দর্যগত সুবিধাও নেই।
তাহলে পারফিউম কোথায় ব্যবহার করা ভালো?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সরাসরি ত্বকে নয়, কাপড়ে স্প্রে করা সবচেয়ে নিরাপদ। ত্বকে ব্যবহার করতে চাইলে কবজি বা হাঁটুর পেছনের মতো তুলনামূলক কম সংবেদনশীল জায়গা বেছে নিন। সংবেদনশীল ত্বক হলে সুগন্ধিবিহীন পণ্য ব্যবহার করাই ভালো।
ইন্টারনেটের আলোচনা কিছুটা নাটকীয় শোনালেও পুরোপুরি ভিত্তিহীন নয়। গলায় এক-দুইবার পারফিউম ব্যবহারেই হরমোন নষ্ট হয়ে যাবে—এমন নয়। তবে নিয়মিত এই সংবেদনশীল জায়গায় পারফিউম লাগালে ত্বকের জ্বালা, দাগ ও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। সচেতন ব্যবহারই এখানে সবচেয়ে বড় সমাধান।
তথ্য সূত্র : কালের কণ্ঠ