শীতকাল এলেই বাংলাদেশের মানুষ নানা রোগের সংক্রমণের কবলে পড়ে। এমনি এ বছর শীতে প্রাণঘাতী নিপা ভাইরাস নামে প্রাণঘাতি অত্যন্ত ছোঁয়াছে ভাইরাস সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এটি অত্যন্ত মারাত্মক রোগ সৃষ্টিকারী ভাইরাস। গত দুই বছরে যারা আক্রান্ত হয়েছে তারা সবাই মৃত্যু বরণ করেছে। সর্বশেষ সম্প্রতি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ০১জন মারা গেছে। ফলে সরকারের স্বাস্থ্য খাত বেশ প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে। যা দেশের জনগণের স্বাস্থ্য রক্ষায় খুবই প্রয়োজন। এ ব্যাপারে সচেতনতা ও সতর্কতা বড় ধরনের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। নিপা একটি ভাইরাস জনিত রোগ। এই ভাইরাস জনিত রোগের নিদিষ্ট কোনো ঔষুধ বা টিকা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। তাই জনগনের মাঝে সর্তকতা ও সচেতনতা সৃষ্টি করাই প্রতিরোধের উপায়। প্রতি বছর নতুন নতুন জেলায় ভাইরাসটি শনাক্ত হচ্ছে।

গত ৭ জানুযারী ২০২৬ রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসি-আর) মিলনায়তনে ্রনিপা ভাইরাসের বিস্তার ও ঝুঁকি বিষয়ে মতাবিনিময় ্রশীর্ষক সভায় বেশ কিছু তথ্য জানানো হয়। এতে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের উপর বেশ বড় ধরনের ঝুঁকি সম্ভবনা সৃষ্টি হয়েছে। ২০০১ সালে বাংলাদেশে সর্ব প্রথম উত্তরাঞ্চলের মেহেরপুর জেলায় নিপা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। আইইভিসিআর তথ্য মতে ২০০১ সাল হতে ২০২৫ই সাল পর্যন্ত ২৫ বছরে নিপা ভাইরাসে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩৪৭ জন। মারা গেছে ২৪৯ জন। এ ছাড়া গত ২০২৪ সালে দেশে নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয় ৫ জন এবং ৫ জনই মৃত্যু বরণ করে। গত ২০২৫ সালে ৪ জনের দেহে এ ভাইরাস শনাক্ত হয় এবং ৪ জনই মৃত্যু বরণ করে। বিশ্বজুড়ে নিপা ভাইরাসের মৃত্যুহার ৭২ শতাংশ হলেও গত দুই বছরে বাংলাদেশে মৃত্যুর হার শত ভাগ। সর্তকতার বিষয় হলো এ ভাইরাসের বিস্তার ও সংক্রমণের ধরণ উদ্বেগজনক হারে পরিবর্তিত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন। বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৩৫টি জেলায় নিপা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের যে জেলাগুলোতে এ ভাইরাসটি তরতাজা মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এবং ছড়িয়েছে বেশি তা হলো নওগাঁ, ভোলা, রাজবাড়ী, নীলফামারী, ফরিদপুর, লালমনির হাট ও মানিকগঞ্জ জেলা। চিন্তার বিষয় হলো পূর্বে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু শীত মৌসুমে কিন্তুু গত ২০২৫ সালে দেখা যায় নওগাঁ জেলার ৮ বছরের এক শিশুর দেহে আগস্ট যা অমৌসুমে শনাক্ত হয়। যা শীত মৌসুম ছাড়া শনাক্ত হয়েছে। ঔ শিশুর সংক্রমণের উৎস ছিল বাদুড়ের আধা-খাাওয়া ফল।

বাদুড়ই এ ভাইরাস বহন করে এবং বাদুড় যে সব ফল খায় তার মাধ্য ছড়িয়ে দেয়। যেমন বরই (কুল), কালোজাম, খেজুর, আম, ইত্যাদি। আগে ছড়িয়েছে খেজুর গাছের কাঁচা রসের মাধ্যমে। বর্তমানে চিহ্নিত হয়ে বিভিন্ন ফলের মাধ্যমে, তাই বলা যায় নিপা শুধু এখন শীত বা খেজুরের রসের মধ্যে সীমাবন্ধ নয় এটি সারা বছরের এবং বহুমুখী সংক্রমনের হুমকিতে পরিণত হয়েছে।


নিপা ভাইরাস কী : নিপা ভাইরাস হলো এক ধরনের আরএনএ ভাইরাস যা প্যারামিক্সোভিরিডি পরিবারের হেলি পাহ ভাইরাস গণের অংশ। যা পশু পাখি থেকে মানুষে ছড়ায়। টেরোপডিডি গোত্রের বাদুড়ই নিপা ভাইরাসের প্রধান বাহক। অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া, চীন, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ায় এই বাদুড় বেশি বসবাস করে। তাছাড়া শূকরও এভাইরাসের জীবানুবহন করে। ২০০৩ সালে বাংলাদেশের নওগাঁ জেলায় শুকরের মাধ্যমে এ রোগ ছড়িয়েছিল।

নিপা ভাইরাসের নামকরণ ঃ বিশ্বে সর্বপ্রথম ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার নেজেরি সেমবিলান রাজ্যের নিপা শহরে এই ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় বলে স্থানের নাম অনুসারে এ ভাইরাসের নাম করণ করা হয় নিপা ভাইরাস।
নিপা ভাইরাসের ইতিহাস ঃ ১৯৯৮ সালে পশ্চিম মালয়েশির শূকরের খামারগুলো থেকে মানুষের মধ্যে এ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। খামারে কাজ করা ২৬৫ জনের দেহে স্নায়ুবিক এবং শ্বাসযন্ত্র জনিত রোগ দেখা দেয় এবং ৫ জন মারা যায়। পরের ১ বছর ১৯৯৯ সালে সিঙ্গাপুরে একই ভাবে এ রোগ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। তখন কসাইখানার ১১ জন আক্রান্ত হয় এবং ১ জন মারা যায়। ইতিহাস থেকে জানা যায় বাদুড় থেকে শুকরে এ ভাইরাসটি ছড়িয়েছিল। উপদ্বীপীয় মালয়েশিয়ার শূকরের খামার ও ফলের বাগানগুলো খুবই কাছাকাছি। ফলে বাদুরের আধা খাওয়া ফল, তাদের প্রস্রাব, লালা মিশ্রিত ফল, পায়খানা শূকরের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। আর এভাবে বাদুড় থেকে শূকরে, শূকর থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ২০০১ সালে সর্বপ্রথম মেহেরপুর জেলায় আবিষ্কৃত হয়। তারপর ২০০৩ সালে নওগাঁয় ২০০৪ সালে রাজবাড়ী ও ফরিদপুরে, ২০০৫ সালে টাঙ্গাইলে ২০০৭ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে ও কুষ্টিয়ায়, ২০০৮ সালে রাজবাড়ী ও মানিকগঞ্জে। পরে ভারতের কোরালা রাজ্যের কোঝিকোড় জেলার একজন চিকিৎসা কর্মীসহ ১৩ জন মারা যায় ২০১৮ সালে।

লক্ষণ ও উপসর্গ ঃ বাংলাদেশে নিপা ভাইরাস প্রধানত খেজুর গাছের কাঁচা রস খাওয়ার ৯ থেকে ১১ দিনের মধ্যে নিপা ভাইরাসের লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে লক্ষনও হলো-প্রাথমিক জ্বর, মাথাব্যথা, পেশীতে ব্যথা, বমি, গলা ব্যাথা, আর ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো উপসর্গ দেখা দেয়। রোগীর মাথাঘুরা, তৃষ্ণা লাগা, বেহুস হওয়া, অসংলগ্ন প্রলাপ এবং মস্তিস্কে তীব্র সংক্রমন, নিউমোনিয়া, ও তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়া। মস্তিষ্কে এসব গুলোর সম্মিলিত প্রভাবে দেখা দেয় এনকেফালাইটিস। এর ফলে রোগী অজ্ঞান, পক্ষাঘাতগ্রস্থ, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যেতে পারে। তবে এ ভাইরাসটি কোনো লক্ষন প্রকাশ ছাড়াই ৪ থেকে ৪৫দিন পর্যন্ত দেহে সুপ্তাবস্থায় থাকতে পারে। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

যেভাবে ছড়ায় ঃ বাংলাদেশে নিপা ভাইরাস বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে ছড়ায় বেশি। খেজুর গাছের হাঁড়ি দিয়ে রস সংগ্রহ করার সময় বাদুড় কাচা রস খেতে এসে তার লালা, মল রসের সাথে মিশ্রিত হয়। পরে মানুষ যখন এই রস কাঁচা খায় তখন মানুষ আক্রান্ত হয়। তারপর মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ে। এটি একটি সংক্রামক ব্যাধি ্রশূকরের সংস্পর্শে এ রোগ ছড়ায় এ ভাইরাসটি খুবই ছোঁয়াচে। তাই মানুষ থেকে মানুষের হাঁচি কাশি, থুথুর মাধ্যমে এটি ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে যে কেউ আসলেই আক্রান্ত হতে পারে। বাদুড়ের খাওয়া ফল যেমনঃ আম, পেঁপে, কলা, পেয়ারা, বরই, খেজুর, জাম, কামরাঙ্গা, লিচু ইত্যাদির মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়াতে পারে।

প্রতিরোাধ ও সচেতনতা ঃ নিপা ভাইরাস খুবই ছোঁয়াচে প্রাণঘাতী ভাইরাস। যেহেতু এ ভাইরাসের কোন ঔষুধ এখনও আবিষ্কার হয় নি। তাই সর্তকতা ও সচেতনতাই এ ভাইরাসের আক্রমন থেকে বেঁচে থাকার উপায়। নিম্ন লিখিত পরামর্শ ও সতর্কতা গ্রহন করা যেতে পারে।
* খেজুরের কাঁচা রস ও আধা খাওয়া ফল খাওয়া যাবে না। এ ব্যাপারে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
* মানুষ আক্রান্ত হলে সরাসরি শারীরিক সংস্পর্শে যাওয়া যাবে না। রোগীদের ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।
* গাছের নিচে পড়ে থাকা কোনো সম্পূর্ণ ফল খেতে হলে সাবান দিয়ে ধুয়ে তা খেতে হবে। আধা খাওয়া ফল খাওয়া যাবে না।
* রোগীকে যে পাত্রে খাবার খাওয়া হয় সে পাত্রে অন্য কেউ খাবার না খাওয়া এবং রোগী থেকে কমপক্ষে ৩ ফুট দূরে অবস্থান করা।
* রোগী পরিচর্যার পর হাত মুখ ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে জীবাণু মুক্ত করতে হবে।
* খেজুরের রস সংগ্রহের সময় পাত্রের মুখ খোলা রাখা যাবে না। মশারি বা জাল দিয়ে পাত্রের মুখ ভালো করে ঢেকে দিতে হবে।
* সর্তকতার সাথে পাত্র হতে রস সংগ্রহ করে অবশ্যই ভালো করে জ্বাল দিয়ে বা ফুটিয়ে খেতে হবে।
* রোগীর থুথু, কফ, যেখানে সেখানে ফেলা যাবে না। কোনো পাত্রে জমা করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। কোনো ব্যাক্তির যদি কোনো রস বা ফল খাওয়ার পর শারীরিক সমস্যা দেখা দেয় তা হলে দ্রুত চিকিৎসকের নিকট নিয়ে যেতে হবে।


পরিশেষে বলা যায়। এই প্রাণঘাতি ভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে নিজে সচেতন হয়ে অপরকে সচেতন করে সামাজিকভাবে প্রতিরোধমূলক প্রচারনা চালাতে হবে। স্বাস্থ্য নিরাপত্তাই হলো সুন্দর সমাজের মূল ভিত্তি। আসলে স্বাস্থের নিরাপত্তা কেবল চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর নির্ভশীল নয়, জীবনধারা, খাদ্যাভাস, সামাজিক আচারণ এবং সতর্কতা, সচেতনতা রোগ প্রতিরোধের মূল হাতিয়ার। সুতরাং সময় মতো উপযুক্ত প্রদক্ষেপ নেওয়াই প্রানহানির হাত থেকে বা সুরক্ষার একমাত্র উপায়।

মোঃ জহিরুল আলম শাহীন
অধ্যক্ষ ও স্বাস্থ্য বিষয়ক কলাম লেখক
ফুলসাইন্দ দ্বি-পাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ,
গোলাপগঞ্জ, সিলেট।

 

তথ্য সূত্র : ইনকিলাব