Bangla Lifestyle Tips

অবসর জীবন হোক ভাবনাহীন

অবসর নেওয়ার জন্য আগে থেকেই চিন্তাভাবনা করা উচিত। কিভাবে অবসর নিলে বাকি জীবনটা শান্তিমতো কাটানো যায়, তা আগেই ঠিক করা উচিত। এ ক্ষেত্রে কিছু বিষয় জেনে রাখলে অবসরের সময়টা স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে কাটানো সম্ভব হবে। টাকাই সব নয় এটি অনেকের কাছেই উভয় সংকটের মতো। অবসরে বেশ কিছু পরিমাণ অর্থ থাকলেই আপনি কি স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারবেন? বিশেষজ্ঞরা…

১০ মুসলিম সুন্দরী যারা হিন্দু সেলিব্রিটিদের বিয়ে করেছেন

১০ মুসলিম সুন্দরী যারা হিন্দু সেলিব্রিটিদের বিয়ে করেছেন

বলিউডের কথা যদি বলি এখানে অনেকে সেলিব্রিটি পাবেন যাদের মধ্যে ভালোবাসা হওয়াটা সাধারণ ব্যাপার। এখানে অনেক এমন সেলিব্রিটি আছেন যারা inter caste marriage করেছেন। মানে যারা বিয়ে করার সময় কোনো জাতি ধর্ম দেখেননি। ভারতে এখনো inter caste marriage কে ভালো চোখে দেখা হয় না। তার মধ্যে যদি হিন্দু-মুসলিমের বিবাহের কথা আসে তাহলে তো অনেক বড়ই…

ঈদের জন্য মধুর প্রতীক্ষা

কেনাকাটার পালা প্রায় শেষ। প্রচণ্ড দুর্ভোগ হবে জেনে এবং নিরুপায় হয়ে তা সহ্য করে রাজধানী থেকে নিজ গ্রামের বাড়িতে যাত্রা চলছে ঘরমুখী মানুষের। পবিত্র জুমাতুল বিদাও সম্পন্ন হলো ২৩ জুন। এখন অপেক্ষা শুধু মাহেন্দ্র ক্ষণটির জন্য। তবে তা এখনো নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই, কবে আকাশের কোণে উঠবে শাওয়াল মাসের কাস্তের মতো একফালি সরু বাঁকা…

বিশ্বনবীর জন্য খাদিজা (রা.)-এর ত্যাগ

151

হিলফ আল ফুজুল : তত্কালীন আরবে কারণে-অকারণে গোত্র থেকে গোত্রে বছরের পর বছর নানা রকম লড়াই ও যুদ্ধ চলতেই থাকত। একটি যুদ্ধ মুহাম্মদ (সা.) তাঁর চাচা যুবায়ের ইবনে মুত্তালিবের সঙ্গে থেকে প্রত্যক্ষ করেন। ভাতৃঘাতী এই যুদ্ধের মধ্যে বিভিন্ন গোত্র প্রধানকে নিয়ে একটি সভা হয়। এতে মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুপ্রেরণায় হিলফ আল ফুজুল নামক একটি সংগঠনের জন্ম হয়।

হিলফ আল ফুজুলের সদস্যগণ শপথ করলেন, তাঁরা দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা, অত্যাচারীদের প্রতিরোধ, বিদেশিদের জানমাল রক্ষা এবং অসহায়দের সাহায্য করবেন। এই প্রথমবারের মতো হিজাজে গোত্রানুগত্যের গণ্ডি অতিক্রম করে ন্যায়ানুগত্যের সংকল্পে আন্তগোত্রীয় একটি সংঘ স্থাপিত হলো। এভাবে অক্ষরজ্ঞানহীন এক যুবক মুহাম্মদ কৈশোরে মক্কার জনপদে, সন্নিহিত পাহাড়-উপত্যকা-প্রান্তরের উন্মুক্ত চারণভূমিতে, যুদ্ধক্ষেত্রে এবং দেশ-বিদেশের বাজারে চরিত্র ও ব্যক্তিত্বের কারণে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরতে সমর্থ হন। তখনো তিনি নবী হননি।

৫৯১ খ্রিস্টাব্দ : বয়স তখন ২০। কিশোর থেকে যৌবনে পদার্পণ করছেন মুহাম্মদ। চাচা আবু তালিবের পরামর্শে মক্কার ধনবতী নারী খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসায় নিযুক্ত হলেন। ব্যবসায় নিযুক্ত হয়ে তিনি খাদিজার প্রতিনিধি হয়ে সিরিয়া গমন করেন। ‘ইসলামী বিশ্বকোষ’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, খাদিজা (রা.)-এর প্রতিনিধি হিসেবে ব্যবসা উপলক্ষে তিনি ইয়েমেনও গিয়েছিলেন। (ইসলামী বিশ্বকোষ, দ্বিতীয় খণ্ড, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৯৩-২৯৪)

সিরিয়া যাত্রাকালে মুহাম্মদ (সা.) একটি গির্জার পাশে অবস্থিত গাছের নিচে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। গির্জার ধর্মযাজক এ দৃশ্য দেখে মন্তব্য করেন, ‘এই গাছের নিচে নবী ছাড়া আর কেউ কখনো বিশ্রাম নেয়নি।’ (ইবনে হিশাম, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ১৭৭)

ইতিহাসবিদরা বলেন, ৫০০ বছর আগে হজরত ঈসা (আ.) একবার এ পথে যাত্রাকালে এই গাছের নিচে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। সে কথা স্মরণে রেখেই পাদরি উপরোক্ত মন্তব্য করেন।

মুহাম্মদ (সা.) তাঁর ২৩ বছর বয়স পর্যন্ত খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে বিশ্বস্ততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। মুহাম্মদ (সা.)-এর তত্ত্বাবধানে খাদিজা (রা.)-এর ব্যবসার দ্রুত প্রসার ও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে।

৫৯৪ খ্রিস্টাব্দ : এ বছর রাসুল (সা.)-এর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। মক্কার বিশিষ্ট ‘তাহেরা’ (পবিত্র) বলে পরিচিত খাদিজা (রা.), মুহাম্মদ (সা.)-এর সুচরিত্রের গুণে মুগ্ধ হয়ে বিবাহের প্রস্তাব দেন। মুহাম্মদ (সা.) এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন। অথচ মুহাম্মদ (সা.) তখন মাত্র ২৪ বছরের এক তরুণ। [সূত্র : মাওলানা মমতাজ উদ্দীন আহমাদ : নবী পরিচয়, ইউপিএল, ঢাকা, ২০০০ (প্রথম প্রকাশ ১৯৬২), পৃষ্ঠা ৪১-৪২]

মুফতি শফি (রহ.) এ বিষয়ে নতুন তথ্য দিয়ে বলেছেন, মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স তখন ছিল একুশ। কোনো কোনো ঐতিহাসিক ২৯, ৩০, ৩৭ বছর যে বলেছেন, তার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। (মুফতি শাফি, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৬)

পাশাপাশি খাদিজা (রা.)-এর বয়স তখন ছিল ৪০, মতান্তরে ৪৫। উপরন্তু খাদিজা (রা.) এ সময় পর্যন্ত আরো দুটি বিয়ে করেছিলেন এবং দুই স্বামীরই মৃত্যু হয়। এ ছাড়া এ দুই স্বামীর ঘরেই অন্তত চারজন সন্তান ছিল।

বিবাহের প্রস্তাব গ্রহণের ক্ষেত্রে মুহাম্মদ (সা.)-এর সিদ্ধান্ত সঠিক বলে পরবর্তীকালে প্রমাণিত হয়। কারণ তাঁর জীবনে খাদিজা (রা.)-এর অবদান পরম আশীর্বাদ বয়ে এনেছিল। প্রথমত, তাঁর অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছিল। তবে সবচেয়ে বড় যে সমর্থনটি এ বিয়ের মাধ্যমে সংঘটিত হলো, তা হচ্ছে, খাদিজা (রা.) নবীর জীবনে নানা বিপদ-আপদে পরম অভিভাবকরূপে আবির্ভূত হলেন। এ বিয়েতে আল্লাহ তায়ালার সরাসরি ইশারা ছিল।

এই সময়টা ছিল মুহাম্মদ (সা.)-এর নবুয়ত পাওয়ার সময়। তিনি নির্জনে ধ্যানে কাটাতে শুরু করেন। এমনকি জাবালে নূর পর্বতের সুউচ্চ হেরা গুহায় যখন নবী (সা.) দীর্ঘ ধ্যানে মগ্ন ছিলেন, তখন অধিকাংশ সময় খাদিজা (রা.) মক্কা শহর থেকে ওই পর্বতের উঁচু গুহায় উঠে তাঁর জন্য খাবার পৌঁছে দিয়েছেন। নবুয়ত নিয়ে যখন মুহাম্মদ (সা.) বিভ্রান্ত, সন্দিহান এবং শঙ্কিত, তখন আশ্চর্যজনকভাবে খাদিজা (রা.) তাঁকে শক্তি জুগিয়েছেন। খাদিজা (রা.)-ই প্রথম বুঝতে পারেন, মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, ফলে তিনি সাহসের সঙ্গে স্বামীর পাশে দাঁড়ান। মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে এই সময় এমন একজন ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন ছিল। তাঁদের দাম্পত্য জীবন সর্বমোট ২৪ বছর অব্যাহত ছিল। খাদিজা (রা.)-এর মৃত্যু পর্যন্ত নবী (সা.) অন্য কোনো বিয়ে করেননি।

দাসপ্রথাবিরোধী অভিযানের শুরু : নবী (সা.) মানবজাতির মুক্তির জন্য পরবর্তীকালে আল্লাহ তাআলার প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামের যেসব সনদ উপস্থাপন করেছিলেন, তা ছিল সব মানুষের জন্য সাম্য প্রতিষ্ঠা। সবাই সবার ভাই, কেউ কারো প্রভু নয়। নবুয়তপ্রাপ্তির আগে থেকেই আল্লাহ সোবহানাহু তাআলা তাঁর দিলে এই চেতনা ঢেলে দিয়েছিলেন।

এর একটা প্রমাণ দেখি জায়েদ (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর একটি সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। বিবাহের পর খাদিজা (রা.) জায়েদ ইবন হারিছা নামক তাঁর ক্রীতদাসকে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সেবায় নিয়োজিত করেন। এই প্রথমবারের মতো মুহাম্মদ (সা.) ক্রীতদাসের মালিক হলেন। আরবের দাসপ্রথা তাঁর হূদয়কে আগেই ভারাক্রান্ত করে রেখেছিল। তিনি জায়েদকে মুক্ত করে দিলেন। পরে যখন জায়েদ তাঁর পিতার সঙ্গে স্বগৃহে ফিরতে অসম্মত হলেন, তখন তাঁর দাসত্বজনিত গ্লানি মুছে দেওয়ার জন্য মুহাম্মদ (সা.) কাবায় সমবেত ব্যক্তিদিগকে সম্বোধন করে বললেন : উপস্থিত ব্যক্তিগণ! তোমরা সাক্ষী রহিলে যে জায়েদ এখন হইতে আমার পুত্র; সে আমার উত্তরাধিকারী হইবে, আমি তাহার উত্তরাধিকার পাইব। পরবর্তীকালে জায়েদ এবং তাঁহার পুত্র উসামা (রা.) মুসলিম ইতিহাসে বহু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। (ইসলামী বিশ্বকোষ, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ২৯৪-২৯৫)

পৌত্তলিকতাবিরোধী মন : প্রথম থেকেই মুহাম্মদ (সা.) পৌত্তলিকতাবিরোধী মনোভাবের ছিলেন। মুসনাদ ইবন হাম্বলের বর্ণনায় দেখা যায়, খাদিজা (রা.)-এর এক প্রতিবেশিনী এক রাতে মুহাম্মদ (সা.)-কে বলতে শুনেছিলেন, হে খাদিজা, আল্লাহর কসম, আমি কখনো লাত আর উয্যার পূজা করব না, আল্লাহর কসম, কখনোই তাদের অর্চনা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তখন খাদিজা (রা.) বললেন, দূর হোক লাত আর উয্যা।

লাত ও উয্যা ছিল আরবদের দুটি প্রতিমা, যাদের অর্চনা করে তারা ঘুমুতে যেত। আরবের সেই ঘোর পৌত্তলিকতার যুগেও ‘হানিফ’ নামে খ্যাত কিছু লোক ছিলেন, যাঁরা এক আল্লাহর বিশ্বাসমূলক লুপ্তপ্রায় ‘মিল্লাতে ইব্রাহিম’-এর অনুসারী ছিলেন এবং মূর্তিপূজার বিরোধিতা করতেন। মুহাম্মদ (সা.)-এর পূর্বপুরুষরা বেশির ভাগ এই মতাবলম্বী ছিলেন।

ইসলামের দাওয়াতের আগে আরবে কাবা ঘরের পুনর্নির্মাণের পর কুরাইশ গোত্র তাদের কৌলীন্য এবং পৌরহিত্যের মর্যাদা বৃদ্ধির পরিকল্পনায় একটি নতুন নিয়ম চালু করল যে হজের সময় অন্যদের মতো তারা ‘আরাফাত’-এ যাবে না। হজরত (সা.) এই নিয়ম লঙ্ঘন করে আরাফাতের প্রান্তরে যান এবং কৌলীন্যগত প্রাধান্যের এমন দাবির সক্রিয় বিরোধিতা করেন। এই বিরোধিতা ছিল মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি সাহসী পদক্ষেপ।

পরবর্তীকালে পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৯৮-১৯৯ আয়াতে নবী (সা.)-এর এই প্রতিবাদের সমর্থন প্রদান করা হয়। জীবনে তিনি কোনো দিন প্রতিমা পূজা যেমন করেননি, তেমনি কোনো দেবদেবীর প্রসাদ ভক্ষণ করেননি। একবার কুরাইশ পৌত্তলিকরা তাদের কোনো দেবীর নামে বলি দেওয়া পশুর গোশ্ত তাঁকে খেতে দিয়েছিল। মুহাম্মদ (সা.) প্রত্যাখ্যান করেন এবং তা খেতে অস্বীকার করেন। এভাবে নবুয়তের আগেই পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধাচরণ করে একটি বিশেষ অবস্থানে তিনি নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন।

৬১১ খ্রিস্টাব্দ : এ বছর জুন মাসের যেকোনো সোমবার দুনিয়ার ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ঘটনাটি ঘটে। এদিন মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রথম পবিত্র কোরআন নাজিল হয়। জাবালে নূর পাহাড়ের হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন মুহাম্মদ (সা.)-কে একজন অলৌকিক ব্যক্তি হঠাৎ এসে বলেন, ‘পড়ুন আপনার পালনকর্তার নামে, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ুন, আপনার পালনকর্তা মহান, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে, যা সে জানত না।’

এর উত্তরে মুহাম্মদ (সা.) বললেন, আমি তো পড়তে জানি না। কিন্তু আগন্তুক মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে বারবার আলিঙ্গন করতে থাকেন। মুহাম্মদ (সা.)-এর শরীর ঘেমে যায়। তিনি ভয় পেয়ে যান, আর মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে ওপরোক্ত পাঁচটি বাক্য। পরবর্তীকালে তা সুরা আলাকের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।

ভীত ও কম্পিত মুহাম্মদ (সা.) জাবালে নূর পর্বত থেকে দ্রুত বাড়ি ফেরেন এবং অস্থিরতার সঙ্গে খাদিজা (রা.)-কে বলতে থাকেন, ‘আমাকে কম্বল দ্বারা জড়িয়ে ধরো, আমি হয়তো মরে যাব।’

খাদিজা (রা.) নবীকে আশ্বস্ত করলেন, তাঁর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা নেই। কিন্তু ঘটনার বিবরণে তিনিও সন্দিহান হয়ে উঠলেন। খাদিজা (রা.)-এর ভাই ওরাকা ছিলেন তাওরাত কিতাবের বিশিষ্ট পণ্ডিত। তাঁকে ঘটনা খুলে বলার পর তিনি বললেন, আগন্তুক জিবরাঈল (আ.)-ই হবেন, যিনি মুসা (আ.)-এর কাছেও এসেছিলেন। (মাওলানা মমতাজ উদ্দীন : নবী পরিচয়, পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা ৪৩-৪৪)

এভাবেই নবুয়তের ঘটনা শুরু হয়েছিল। ৬১১-৬১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অনেকটা গোপনে ইসলামের দাওয়াতি কাজ আরম্ভ হলো। এ অবস্থায় প্রথম যাঁরা মুসলিম হলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন :

১. খাদিজা (রা.) (নারীদের মধ্যে প্রথম), ২. আলী (রা.) (বালকদের মধ্যে প্রথম), ৩. আবু বকর সিদ্দিক (রা.) (বয়স্কদের মধ্যে প্রথম), ৪. জায়েদ ইবনে হারেছা (রা.) (দাসদের মধ্যে প্রথম)। এদের মধ্যে সবার আগে আবু বকর সিদ্দিক (রা.) পাঁচজনকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে প্রথম দিনই নবী (সা.)-এর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করান, তাঁরা হলেন :

১. যোবাইর ইবনে আওয়াম (রা.), ২. ওসমান ইবনে আফফান (রা.), ৩. আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.), ৪. তালহা (রা.), ৫. সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)।

৬১৫ খ্রিস্টাব্দ : নবুয়তের চতুর্থ বছরে মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয় :

হে চাদর (বা কম্বল) আবৃত নবী

উঠুন (মানবজাতির উদ্দেশে) সাবধানবাণী প্রচার করুন

আপনার পালনকর্তার বড়ত্ব ঘোষণা করুন।

(সুরা মুদাসসির, আয়াত ১-৩)

প্রকৃতপক্ষে, তত্কালীন আরব সমাজের বাস্তব সমাজচিত্র পৌত্তলিক চরিত্রের। সব বিষয়েই এরা শিরক করত এবং মূর্তি পূজা ছিল এদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। আর এ কাজের ধর্মনেতা ছিল নবী (সা.)-এর বংশ ও বৃহত্তর পরিবারের লোকেরাই। ফলে নিজের আত্মীয়স্বজনদের দাওয়াত দেওয়ার মধ্য দিয়ে নবী (সা.)-এর তাবলিগ শুরু হলো।

লেখক : সিনিয়র উপ-প্রধান তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদপ্তর

মুসলমানদের হাতেই বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়

৫৬

মরক্কোর কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। ফাতেমা নামের একজন মুসলিম নারী ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে এটি প্রতিষ্ঠা করেন
অ- অ অ+

বিশ্ববিদ্যালয় শব্দটির উদ্ভব হয়েছে লাতিন Universitas Magistrorum et Scholarium থেকে। যার অর্থ শিক্ষক ও পণ্ডিতদের সম্প্রদায়। বিদ্যালয় শব্দটির সঙ্গে বিশ্ব শব্দটি যোগ করার অর্থ হলো, এই বিদ্যাপীঠ কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ বা জাতির জন্য নয়। এটি সারা বিশ্বের জন্য। এখানে সারা বিশ্বের যেকোনো দেশের মানুষ পড়তে ও পড়াতে পারবে। বর্তমানে পৃথিবীতে লাখো ইউনিভার্সিটি আছে। কিন্তু কোনটি পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়, তা নিয়ে কয়েকটি অভিমত পাওয়া যায়।

চীনাদের দাবি হচ্ছে, পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হলো চীনের সাংহাই হায়ার স্কুল। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ২২৫৭ সালে। অল্পকাল পরেই এটি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে আরো একটি বিশ্ববিদ্যালয় চীনের ঝু ডায়নাস্টির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির নাম ইম্পেরিয়াল কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় (Imperial Central School)। খ্রিস্টপূর্ব ১০৪৬ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি টিকেছিল ২৪৯ বছর পর্যন্ত।

পাকিস্তানিদের দাবি হলো, পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হলো পাকিস্তানের তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়। আজ থেকে দুই হাজার ৭০০ বছর আগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। বেবিলন, গ্রিস, সিরিয়া, পারস্য, আরব, চীনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ছাত্ররা এখানে ভিড় করত। প্রতিকূল যোগাযোগব্যবস্থা, অমসৃণ পথের দুঃসহ যন্ত্রণা আর পথে মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে উচ্চশিক্ষার হিরণ্ময় সাফল্য লাভের আশায় জ্ঞানপিপাসুদের মেলা বসত এখানে। সারা বিশ্ব থেকে ১০ হাজার ৫০০ জন ছাত্র উচ্চতর গবেষণার জন্য আসতেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বিশাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমান পাকিস্তানের রাওয়ালপিণ্ডি জেলায় ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান। পাকিস্তানের বর্তমান রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে মাত্র ৩২ কিলোমিটার দূরে এটি অবস্থিত। তার ধ্বংসাবশেষ এখনো সেখানে রক্ষিত আছে।

পণ্ডিত ব্যক্তিরা অবশ্য এটাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাপকাঠিতে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। তাদের দাবি হলো, তক্ষশীলা শিক্ষালয়টি বর্তমানের বিভিন্ন ক্যাটাগরির বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় বলতে সাধারণত আমাদের চোখে ভেসে ওঠে কোনো একটি একক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। যেটি পরিচালিত হয় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দিয়ে। কিন্তু তক্ষশীলার ক্ষেত্রে তা যায় না। এখানে শিক্ষকরা ছিলেন স্বাধীন। যে যাঁর মতো পাঠদান করতেন। তাঁরা খণ্ড খণ্ড বিভাগের দায়িত্ব থেকে নিজ নিজ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম ও পাঠ্যসূচি পরিচালনা করতেন। তক্ষশীলাকে বিশ্ববিদ্যালয় বিবেচনা করা যায় কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞ মহলে যুক্তি-পাল্টা যুক্তির তীর নিক্ষেপ চললেও তক্ষশীলা যে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল, সে বিষয়ে সবাই একমত।

এদিকে ভারতীয়দের দাবি হলো, বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে ভারতের বিহারের রাজগিরের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। ইতিহাসের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে সময়ের ব্যবধানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ও একসময় বন্ধ হয়ে যায়। জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়টি সর্বপ্রথম ৪৫৫ থেকে ৪৬৭ সাল পর্যন্ত বন্ধ থাকে। পরে দ্বিতীয় দফায় ৬০০ সালে বন্ধ হয়ে ৬৬৮ সালে পুনরায় চালু হয়।

কিন্তু ১১৯৩ সালে এটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ৮২১ বছর পর সেই নালন্দার দরজা ফের খুলেছে ২০১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর সোমবার। মাত্র দুটি বিভাগে ১১ জন শিক্ষক ও ১৫ শিক্ষার্থী নিয়ে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করেছে নালন্দা। নালন্দাকে নিয়ে গর্ব করার অনেক কিছুই ছিল। এখানে দুই হাজার শিক্ষক ও ১০ হাজার ছাত্র ছিল। নালন্দা মূলত বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা ও গবেষণার জন্য নির্মিত হয়েছে। পরে সেখানে হিন্দু ধর্মচর্চা শুরু হয়।

এসব মত-দ্বিমত পেছনে রেখে মুসলমানরা দাবি করে, পৃথিবীতে তারাই সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য দলিল-দস্তাবেজ মুসলমানদের পক্ষে। গিনেস বুকের রেকর্ড অনুসারে মরক্কোর ফেজ নগরীর কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। (http://www. guinnessworldrecords.com/world-records/oldest-university)

জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (United Nations Educational, Scientific and Cultural Organization) বা ইউনেস্কো (UNESCO)-এর ঘোষণা মতেও কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। (A History of the University in Europe. Vol. I : Universities in the Middle Ages, Cambridge University Press, 2003, ISBN 978-0-521-54113-8, pp. 35–76 (35)

মরক্কোর ফেজ নগরীর এই প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৬০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির ১১০০তম বর্ষপূর্তি ঘটে। এই বিশ্ববিদ্যালয় চালুর সময় ছিল ইসলামের সোনালি যুগ। নবম শতাব্দীর প্রথম দিকে ফেজ নগরী ছিল অনেকটা গ্রামসদৃশ। তখন মরক্কোর শাসক আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন : ‘হে আল্লাহ! আপনি এ নগরীকে আইন ও বিজ্ঞানের কেন্দ্র হিসেবে কবুল করুন।’ সে স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ফেজ নগরীর এক বিধবা ধনাঢ্য মহীয়সী নারী চালু করেন কারাওইন মসজিদ। কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয় ৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মসজিদের অংশ হিসেবে। এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ফাতিমা আল ফিহরি নামের এক মহীয়সী নারী। তাঁর বাবা ছিলেন ফেজ নগরীর ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মুহাম্মদ আল ফিহরি। আল ফিহরি পরিবার ফেজে আসেন নবম শতাব্দীর প্রথম দিকে। তাঁরা এখানে আসেন তিউনিসিয়ার কারাওইন থেকে। সে সূত্রে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রাখা হয় কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়। তাদের সঙ্গে কারাওইন থেকে তাঁদের সমাজের বেশ কিছু লেখক ফেজে এসে নগরীর পশ্চিমের অংশে বসবাস শুরু করেন। ফাতিমা আল ফিহরি ও তাঁর বোন মরিয়ম আল ফিহরি উভয়েই ছিলেন সুশিক্ষিত। তাঁরা উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার কাছ থেকে প্রচুর অর্থসম্পদ পান। ফাতিমা তাঁর অংশের সব অর্থ খরচ করেন তাঁর সমাজের লেখকদের জন্য একটি মসজিদ তৈরির পেছনে।

কেবল ইবাদতের স্থান না হয়ে এই মসজিদ শিগগিরই হয়ে ওঠে ধর্মীয় নির্দেশনা ও রাজনৈতিক আলোচনার স্থল। মসজিদটি পুরোপুরি নির্মাণ করতে সময় লেগে যায় ২৭৮ বছর। ইতালির বোলোনা (Bologna)-য় যখন প্রথম ইউরোপীয় বিশ্ববিদ্যালয় ্রপ্রতিষ্ঠিত হয়, তারও আগে কারাওইন হয়ে ওঠে এক বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়। বলতে আপত্তি কোথায়, সভ্য দুনিয়াকে লেখাপড়া শিখিয়েছে মুসলমানরা! শুরুতে এটি ছিল ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র। পরে সেখানে ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে জাগতিক বিষয় পড়ানো শুরু করা হয়। অচিরেই এর ছাত্রসংখ্যা দাঁড়ায় আট হাজারে। তাঁরা সেখানে চিকিৎসাবিদ্যা থেকে শুরু করে ইতিহাস-ভূগোলসহ অনেক বিষয়েই উচ্চশিক্ষা লাভ করতে থাকেন। ফেজকে তখন বলা হতো ‘পাশ্চাত্যের বাগদাদ’—‘বাগদাদ অব দ্য ওয়েস্ট’।

ইউরোপের মহাজাগরণের মধ্য দিয়ে মুসলমানদের সোনালি যুগের অবসান ঘটে। মধ্য-অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এসে দেখা গেল, কারাওইন ছেড়ে গেছেন জ্ঞানী-গুণী আর বিজ্ঞানীরা। সেখানে অবশেষ রইল কেবল ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা। ১৯১২-৫৬ সময়ে মরক্কো ছিল ফ্রান্সের প্রটেক্টরেট। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়টি ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ইউরোপের ষড়যন্ত্রের বলি হয় এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। সে সময় সেখানে পরীক্ষা ও ডিগ্রি দেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। ছাত্রদের থাকতে হয় আলোহীন-বায়ুহীন প্রকোষ্ঠে, জানালাহীন কক্ষে।

১৯৫৬ সালে মরক্কো স্বাধীন হয়। জাতিকে বিংশ শতাব্দীর উপযোগী করে গড়ে তোলার দৃঢ়তা নিয়ে বাদশাহ মুহাম্মদ কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার চালু করেন গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, বিদেশি ভাষাবিষয়ক পাঠক্রম। ১৯৫৭ সালে তিনি কারাওইনে চালু করেন মহিলা শাখা। কারাওইন বিশ্ববিদ্যালয় এখন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম এক ধর্মীয় ও জাগতিক শিক্ষাকেন্দ্র। এই বিশ্ববিদ্যালয় মধ্যযুগের মুসলমান ও ইউরোপীয়দের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাবিষয়ক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রাখে। অনেক অমুসলিমও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম অমুসলিম অ্যালামনি ছিলেন ইহুদি দার্শনিক ও ধর্মতত্ত্ববিদ মুসা বিন মাইমুন বা মাইমোনাইডস (১১৩৫-১২০৪)। তিনি শিক্ষা লাভ করেন আবদুল আরব ইবনে মোয়াশাহার তত্ত্বাবধানে। কার্টিওগ্রাফার মুহাম্মদ ইদ্রিসির (মৃত্যু : ১১৬৬) মানচিত্র ইউরোপ অভিযানে ব্যবহার হয়েছিল রেনেসাঁর যুগে। ফেজে এ মানচিত্র দীর্ঘদিন সংরক্ষিত ছিল। এই বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টি করেছে অসংখ্য জ্ঞানীগুণী, যাঁরা মুসলিম বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষার ইতিহাসে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ইবনে রুশায়েদ আল সাবতি (মৃত্যু : ১৩২১), মুহাম্মদ ইবনে আলহাজ আলআবদারি আলফাসি (মৃত্যু : ১৩৩৬), শীর্ষস্থানীয় তাত্ত্বিক মালিকি এবং সুপরিচিত পরিব্রাজক ও লেখক লিও আফ্রিকানাস।

প্রথম দিকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মালেকি মাজহাব অনুসারে ইসলাম ধর্মচর্চা করা হতো। ধীরে ধীরে এই প্রতিষ্ঠানকে রূপ দেওয়া হয় একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫৭ সালে বাদশাহ পঞ্চম মুহাম্মদ সেখানে চালু করেন গণিত, পদার্থবিদ্যা, রসায়নশাস্ত্র ও বিদেশি ভাষা শিক্ষার কোর্স।

এই বিশ্ববিদ্যালয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল ক্ষমতাধর সুলতানদের কাছ থেকে। প্রতিষ্ঠানটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে রয়েছে বিশ্বখ্যাত লাইব্রেরি। রয়েছে বিপুলসংখ্যক পাণ্ডুলিপি। ১৩৪৯ সালে সুলতান আবু ইনান ফ্যাবিস একটি লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। সে লাইব্রেরিতে অসংখ্য মূল্যবান পাণ্ডুলিপি রাখা হয়। আজকের দিনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব মূল্যবান পাণ্ডুলিপি রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে আছে : হরিণের চামড়ার ওপর ইমাম মালেক (রহ.)-এর লেখা মুয়াত্তার পাণ্ডুলিপি, ১৬০২ সালে সুলতান আহমাদ আল মনসুরের দেওয়া কোরআনের কপি, সিরাতে ইবনে ইসহাক, ইবনে খালদুনের বই ‘আল-ইবার’-এর মূল কপি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে পড়ানো হতো কোরআন ও ফিকহ (ইসলামী আইনশাস্ত্র), ব্যাকরণ, বক্তৃতাদানবিদ্যা বা অলংকারশাস্ত্র, যুক্তিবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, ইতিহাস, ভূগোল ও সংগীতবিদ্যা।

মধ্যযুগে কারাওইন মুসলমান ও ইউরোপের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও জ্ঞান বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অগ্রণায়ন বিদ্বজ্জন ইবনে মাইমুন (১১৩৫-১২০৪), আল-ইদ্রিসি (মৃত ১১৬৬), ইবনে আরাবি (১১৬৫-১২৪০), ইবনে খালদুন (১৩৩২-১৩৯৫), ইবনে খতিব, আল-বিতরুজি (অ্যালপে ট্রেজিয়াম), ইবনে হিরজিহিম ও আল ওয়্যাজ্জেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র বা শিক্ষক ছিলেন। যেসব খ্রিস্টান পণ্ডিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং স্কলার ছিলেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বেলজিয়ামের নিকোলাস ক্লোনয়ার্টস ও ওলন্দাজ গোলিয়াস। ধারাক্রমে মরক্কোর বিভিন্ন শাসক কারাওইন মসজিদ কমপ্লেক্সের সম্প্রসারণ করেছেন অব্যাহতভাবে। সেখানে ২০ হাজার নামাজি একসঙ্গে নামাজ আদায় করার সুযোগ পান। শুরুতে মসজিদটির দৈর্ঘ্য ছিল ৩০ মিটার। ছিল একটি প্রাঙ্গণ ও চারটি স্তম্ভপরিবেষ্টিত ঘোরানো গলি। এর প্রথম সম্প্রসারণ হয় ৯৫৬ খিস্টাব্দে। এই সম্প্রসারণের কাজ করান কর্ডোভার উমাইয়া খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমান। তখন মসজিদ সম্প্রসারিত করা হয়। মিনার স্থানান্তর করা হয়। তখনকার দিনে ফেজ নগরীতে একটা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, কারাওইনের মিনার থেকে আজানের আওয়াজ আসার পরপরই নগরীর অন্যান্য মসজিদে আজান শুরু করা হতো। এই মসজিদে সবচেয়ে ব্যয়বহুল পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন হয় ১১৩৫ খ্রিস্টাব্দে, মুরাবিদ শাসক সুলতান আলী ইবনে ইউসুফের তত্ত্বাবধানে। তিনি আদেশ দেন, মসজিদের স্তম্ভপরিবেষ্টিত ঘোরানো গলি ১৮টি থেকে ২১টিতে উন্নীত করতে হবে। এ সময় এর কাঠামোর সম্প্রসারণ ঘটানো হয় তিন হাজার বর্গমিটার।

পবিত্র মেরাজের প্রাপ্তি ও শিক্ষা

1111

মেরাজ ইসলামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। এটি মহানবী (সা.)-এর বিশেষ মুজেজা ও বৈশিষ্ট্য। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছাড়া অন্য কোনো নবী এই সৌভাগ্য লাভ করতে পারেননি।

মেরাজ শব্দটি আরবি। এর অর্থ সিঁড়ি। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে যে অলৌকিক সিঁড়ির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সপ্ত আসমানের ওপরে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়, সেই সিঁড়িকে মেরাজ বলা হয়। সাধারণত হিজরতের আগে একটি বিশেষ রাতের শেষ প্রহরে বায়তুল্লাহ শরিফ থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত মহানবী (সা.)-এর ‘বোরাকে’ ভ্রমণ, অতঃপর সেখান থেকে অলৌকিক সিঁড়ির মাধ্যমে সপ্ত আসমান এবং সেখান থেকে আরশে আল্লাহর সান্নিধ্যে গমন ও আবার বায়তুল মুকাদ্দাস হয়ে বোরাকে আরোহণ করে প্রভাতের আগেই মক্কায় নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তনের ঘটনাকে মেরাজ বলা হয়।

মেরাজের পাশাপাশি আরেকটি শব্দ ব্যবহৃত হয়। সেটি হলো ইসরা। ইসরা অর্থ রাত্রিকালীন ভ্রমণ। ইসরা হলো পৃথিবীর এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ। আর পৃথিবী থেকে ঊর্ধ্বলোকে ভ্রমণকে মেরাজ বলা হয়। পবিত্র কোরআনের সুরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতে ‘ইসরা’ বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। আর সুরা নাজমের ১৩ থেকে ১৯ আয়াত পর্যন্ত মেরাজের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়া ২৬-এর বেশি সাহাবি থেকে বুখারি, মুসলিমসহ প্রায় সব হাদিস গ্রন্থে মেরাজের ঘটনাবলি বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং মেরাজ অকাট্যভাবে প্রমাণিত একটি সত্য ঘটনা।

মেরাজের সংক্ষিপ্ত ঘটনা

আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) তাঁর তাফসিরে মেরাজ গ্রন্থে সংশ্লিষ্ট হাদিসগুলো বিস্তারিত বর্ণনা করে বলেন, সত্য কথা হলো, নবী (সা.) ইসরা সফর জাগ্রত অবস্থায় করেন, স্বপ্নে নয়। তিনি মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত এ সফর বোরাকযোগে করেন। বায়তুল মুকাদ্দাসের দ্বারে উপনীত হয়ে তিনি বোরাকটি অদূরে বেঁধে নেন এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদে প্রবেশ করে কেবলামুখী হয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। এরপর বিশেষ সিঁড়ির সাহায্যে প্রথমে প্রথম আসমান, তারপর অন্যান্য আকাশে যান। ওই সিঁড়িটির স্বরূপ সম্পর্কে আল্লাহই ভালো জানেন। প্রতিটি আকাশে সেখানকার ফেরেশতারা তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। ষষ্ঠ আকাশে হজরত মুসা (আ.) ও সপ্তম আকাশে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। এরপর তিনি নবীদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো অতিক্রম করেন। তারপর এক বিশাল ময়দানে গিয়ে তিনি লক্ষ করেন যে সেখানে ভাগ্যলিপি লেখার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এরপর তিনি সিদরাতুল মুনতাহা দেখেন। সেখানে আল্লাহর নির্দেশে স্বর্ণের প্রজাপতি ও নানা রঙের প্রজাপতি ছোটাছুটি করছিল। ফেরেশতারা স্থানটিকে ঘিরে রেখেছিল। সেখানেই তিনি একটি দিগন্তবেষ্টিত সবুজ রঙের পালকির মতো ‘রফরফ’ ও বায়তুল মামুরও দেখেন। বায়তুল মামুরের কাছেই কাবার প্রতিষ্ঠাতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) প্রাচীরের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসা ছিলেন। এই বায়তুল মামুরে দৈনিক ৭০ হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন। যাঁরা একবার এখানে এসেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত তাঁদের পুনরায় প্রবেশ করার সুযোগ নেই। তারপর রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বচক্ষে জান্নাত ও দোজখ দেখেন। সে সময় তাঁর উম্মতের জন্য প্রথমে ৫০ ওয়াক্তের নামাজ ফরজ হওয়ার নির্দেশ হয়। এরপর তা কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে সব ইবাদতের মধ্যে নামাজের বিশেষ গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়। এরপর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসে ফিরে আসেন এবং বিভিন্ন আকাশে যেসব নবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল, তাঁরাও তাঁর সঙ্গে বায়তুল মুকাদ্দাসে অবতরণ করেন। তাঁরা এখান থেকেই বিদায় নেন এবং রাসুল (সা.) বোরাকে সওয়ার হয়ে অন্ধকার থাকতেই মক্কায় পৌঁছে যান। রাসুল (সা.)-এর এই ভ্রমণে আল্লাহর নির্দেশে সঙ্গী ছিলেন হজরত জিবরাঈল (আ.)।

মেরাজের তারিখ

ইমাম কুরতুবি (রহ.) তাঁর তাফসির গ্রন্থে লিখেছেন, মেরাজের তারিখ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। মুসা ইবনে ওকবার বর্ণনা মতে, এই ঘটনা হিজরতের ছয় মাস আগে সংঘটিত হয়। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, হজরত খাদিজার ওফাত নামাজ ফরজ হওয়ার আগে হয়েছিল। ইমাম জুহুরি (রহ.) বলেন, হজরত খাদিজার ওফাত নবুয়তপ্রাপ্তির সাত বছর পরে হয়েছিল। মুহাদ্দেসগণ বিভিন্ন রেওয়ায়েত বা বর্ণনা উল্লেখ করার পর কোনো সিদ্ধান্ত লিপিবদ্ধ করেননি। (মা’আরেফুল কোরআন)

এ থেকে বোঝা যায়, ২৭ তারিখকে শবেমেরাজ নির্ধারণ করা কঠিন। তবে হ্যাঁ, রাতটি অবশ্যই ফজিলতপূর্ণ। এই রাতে আল্লাহ তাআলা রাসুল (সা.)-কে বিশেষ নৈকট্য দান করেন। মুসলমানদের নামাজ উপহার দেন। তাই নিঃসন্দেহে ওই রাতই ছিল ফজিলতপূর্ণ। এই রাতের ফজিলত নিয়ে কোনো মুসলমানের সন্দেহ থাকতে পারে না। কিন্তু নির্ভরযোগ্য মতানুসারে মেরাজ সংঘটিত হয়েছিল নবুয়তের পঞ্চম বছর। এ ঘটনার পর নবী করিম (সা.) আরো ১৮ বছর সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু শবেমেরাজের ব্যাপারে এ দীর্ঘ সময়ে কোথাও কোনো বিশেষ হুকুম তিনি দিয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ রাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও রাত জেগে থাকেননি। সাহাবিদেরও জাগতে বলেননি। রাসুল (সা.) পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পর ১০০ বছর সাহাবায়ে কেরাম জীবিত ছিলেন। শতাব্দীজুড়ে এমন একটি ঘটনাও পাওয়া যায়নি, যেখানে সাহাবায়ে কেরাম ২৭ রজবকে বিশেষভাবে উদ্যাপন করেছেন। সুতরাং যে কাজ রাসুল (সা.) করেননি, সে কাজ সাহাবায়ে কেরামও পরিহার করেছেন। তাই ২৭ রজবে প্রচলিত ইবাদত-বন্দেগিগুলোকে দ্বীনের অংশ মনে করা, সুন্নত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হাদিস ও সুন্নাহসম্মত নয়।

মেরাজের তাত্পর্য

ইসলামের ইতিহাসে মেরাজ অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। যখন সব দিক থেকে রাসুলুল্লাহ (সা.) মারাত্মক সংকট ও শোকের সম্মুখীন হয়েছিলেন, সেই দুঃসময়ে আল্লাহ পাক তাঁর প্রিয় হাবিবকে তাঁর সান্নিধ্য লাভের সুযোগ দিয়েছিলেন। পার্থিব জীবনের অভিভাবক চাচা আবু তালেবের মৃত্যু, প্রাণপ্রিয় সহধর্মিণী উম্মুল মুমিনিন হজরত খাদিজা (রা.)-এর ইন্তেকাল, তায়েফের হৃদয়বিদারক ঘটনা, মক্কার কাফিরদের অমানবিক আচরণ, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন বিপন্ন ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। মেরাজের মাধ্যমে তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়, কালো রাতের পরই আছে উজ্জ্বল প্রভাত। ইসলামের বিজয় সমাগত। এরই সঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁকে পূর্ণতা লাভের সবকও দান করেছিলেন। আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে আলমে বরজখ, জান্নাত, জাহান্নাম, লওহ-কলম, আরশ-কুরসি প্রত্যক্ষ করান।

মেরাজের প্রাপ্তি

মেরাজে মহান আল্লাহ তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বান্দা মুহাম্মদ (সা.)-কে নিজ সান্নিধ্যে ডেকে নিয়ে উম্মতে মুহাম্মদিকে পুরস্কারস্বরূপ কয়েকটি বস্তু প্রদান করেন—এক. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। এই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফজিলতের দিক দিয়ে ৫০ ওয়াক্ত নামাজের সমান। দুই. সুরা বাকারার শেষের দুটি আয়াত মেরাজেই অবতীর্ণ হয়। এ আয়াতগুলোতে উম্মতে মুহাম্মদির প্রতি আল্লাহর অশেষ রহমত ও অনুগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। তিন. উম্মতে মুহাম্মদির মধ্যে যারা কখনো শিরক করেনি, তাদের ক্ষমা করার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে মেরাজে। চার. নামাজে যে ‘আত্তাহিয়্যাতু’ পড়া হয়, সেটিও মেরাজের উপহার।

পবিত্র মেরাজের শিক্ষা

মহানবী (সা.) মেরাজ থেকে ফিরে আসার পর সুরা বনি ইসরাইলের মাধ্যমে ১৪টি দফা মানুষের সামনে পেশ করেন। বর্তমান সময়ে ক্ষয়ে যাওয়া সমাজ সংস্কারে এই ১৪ দফা বিশেষ ভূমিকা রাখবে।

১. আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা যাবে না।

২. মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে হবে। আল্লাহ বলেন, “…মা-বাবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো। তাঁদের একজন বা উভয়ে বৃদ্ধ অবস্থায় যদি তোমাদের সামনে উপনীত হয়, তাহলে তাঁদের সঙ্গে উহ্ শব্দটি পর্যন্ত কোরো না। তাঁদের ধমকের সুরে জবাব দিয়ো না; বরং তাঁদের সঙ্গে মর্যাদাসূচক কথা বলো। তাদের সামনে বিনয়ী থেকো আর দোয়া করতে থাকো—‘হে আমার প্রতিপালক, তাঁদের প্রতি তেমনি দয়া করো, যেমনি তাঁরা শৈশবে আমাদের লালন-পালন করেছেন’।’’ (সুরা : বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৩-২৪)

৩. নিজ কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে।

৪. আত্মীয়স্বজনকে তাদের অধিকার দিয়ে দিতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আত্মীয়স্বজনকে তাদের অধিকার দাও। আর মুসাফিরদের হক আদায় করো। (সুরা : বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৬)

৫. অপব্যয় করা যাবে না।

৬. মানুষের অধিকার আদায়ে ব্যর্থ হলে বিনয়ের সঙ্গে তা প্রকাশ করতে হবে। ছলচাতুরী ও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া যাবে না।

৭. ব্যয়ের ক্ষেত্রে বেহিসাবি হওয়া যাবে না। আবার কৃপণতাও প্রদর্শন কোরো না।

৮. সন্তানদের হত্যা করা যাবে না। এটি মহাপাপ।

৯. জেনা-ব্যভিচারের কাছেও যাওয়া যাবে না। কেননা এটি নিকৃষ্ট ও গর্হিত কাজ।

১০. কোনো প্রাণী অন্যায়ভাবে হত্যা করা যাবে না। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে তার উত্তরাধিকারীকে এই অধিকার দেওয়া হয়েছে যে সে চাইলে রক্তের বিনিময় চাইতে পারে। তবে প্রতিশোধের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা যাবে না।

১১. এতিমের সম্পদের ধারেকাছেও যাবে না।

১২. ওজনে কম দিয়ে মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। দাঁড়িপাল্লা সোজা করে ধরতে হবে।

১৩. যে বিষয়ে জ্ঞান নেই, সে বিষয়ে মতামত দেওয়া অন্যায়। চোখ, কান, অন্তর সব কিছুই কিন্তু একদিন জিজ্ঞাসিত হবে।

১৪. জমিনে দম্ভসহকারে চলা যাবে না। এগুলো সবই মন্দ ও ঘৃণিত কাজ। এই ১৪ দফাই মেরাজের প্রকৃত শিক্ষা।

লেখক : পরিচালক, দারুল আরকাম ইনস্টিটিউট, টঙ্গী, গাজীপুর

ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার

্রিও্োও্র

পৃথিবীজুড়ে গড়ে ওঠা তিলোত্তমা নগরীগুলোর রূপ-লাবণ্যে শ্রমিকের কৃতিত্বই অগ্রগণ্য। কল-কারখানা থেকে নিয়ে সুবিশাল ইমারত, ফসলের মাঠ পর্যন্ত সব কিছুতেই শ্রমিকের মমতার হাত। কিন্তু শত আক্ষেপ! সভ্যতার কারিগর এ শ্রেণিটি সর্বদা উপেক্ষিত, অবহেলিত ও সুবিধাবঞ্চিতই থেকেছে। উদয়াস্ত শ্রম অব্যাহত রেখে তিল তিল করে যে শ্রমিক মালিকের অর্থযন্ত্রটি সচল রাখে, সেই মালিকের অবিচারেই দুর্বিষহ হয়ে ওঠে তার জীবন। শ্রমিক কষ্ট করে সুবিশাল অট্টালিকা তৈরি করলেও তাতে নেই তার সামান্য ঠাঁই। তাকে থাকতে হয় গাছতলায়। শ্রমিকদের ওপর হাজার বছর ধরে চলা লাঞ্ছনার অধ্যায়ের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটেছে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাত ধরে। মানবতার পরম বন্ধু হজরত মুহাম্মদ (সা.) শ্রমিক নির্যাতনের সাইক্লোন থামিয়ে দিয়েছেন কঠোর হস্তে। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণেও বাদ পড়েনি শ্রমিক। এমনকি মৃত্যু শয্যায়ও তিনি ভেবেছেন শ্রমিকদের নিয়ে। হজরত উম্মে সালমা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃত্যুশয্যায় যে অসিয়ত করে যান তা ছিল—‘সাবধান থাকবে নামাজ ও তোমাদের অধীনস্থদের বিষয়ে।’ (ইবনে মাজাহ : ১/৫১৯)

আমাদের সমাজে জেলে, তাঁতি, কুমার, মুচি, মেথর, শ্রমিক, কুলি, মজুরকে আক্ষরিক অর্থে নীচু শ্রেণি মনে করা হচ্ছে। আর যখনই মুসলিম সমাজে কর্মকে ছোট করে দেখার প্রবণতা শুরু হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গেই দরিদ্রতা তাদের পেয়ে বসেছে। লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়ে কুলির কাজ করাকে অসম্মানের চোখে দেখে না অথচ নিজের দেশে শ্রমিকের কাজ করলে নাকি বংশগৌরব নষ্ট হয়। অভিভাবকরাও সন্তানকে লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে মেথরের কাজে পাঠাতে রাজি, কিন্তু দেশে তাকে কারিগরি শিক্ষা, শ্রম ও কর্ম শিক্ষা দিতে রাজি নয়। তাদের দৃষ্টিতে শুধু অফিসের চাকরিই বড়, তাই তো সামান্য চাকরির জন্য লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েও অফিসের ‘চাকরি’ খোঁজেন সবাই। ইসলাম এসে সব বৈধ পেশাকে সমান মর্যাদা প্রদান করেছে। কেননা সভ্যতার চাকা সচল রাখতে সব পেশায়ই লোক প্রয়োজন। একজন শিক্ষকের সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য ড্রাইভার প্রয়োজন, আবার সেই ড্রাইভারের সন্তানকে লেখাপড়া শেখানোর জন্য পাঠাতে হয় শিক্ষকের কাছে। তাই রাসুলে কারিম (সা.) প্রথমে কর্মের প্রতি মানুষের ঘৃণার মূলোৎপাটন করেছেন।

দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় সম্মান ও মর্যাদা হলো নবুয়ত। নবুয়তের ওপর পৃথিবীতে আর কোনো মর্যাদা নেই। শ্রমজীবী হওয়া সত্ত্বেও নবীগণ নবুয়তের মহামর্যাদার আসনে আসীন হতে পেরেছিলেন। শ্রমিক হওয়া নবীজি (সা.)-কে বিশ্বনবী হতে বাধাগ্রস্ত করেনি। রাসুলে কারিম (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ যত নবীই প্রেরণ করেছেন, সবাই মেষ চরিয়েছেন।’ সাহাবিগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনিও? নবীজি (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিও। আমি নির্ধাতি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মক্কাবাসীর মেষ চরাতাম।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৩/৪৬৬) তিনি বিশ্বনেতা হয়েও নিজেকে শ্রমিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে শ্রমিকগোষ্ঠীকে ধন্য করেছেন। তাঁর শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। শ্রমিকের জন্য অফুরন্ত সম্ভাবনার দিগন্তকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন তিনি। নিজের প্রাণাধিক প্রিয় কন্যা হজরত ফাতিমা (রা.)-কে আলী (রা.) নামের তৎকালীন পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠতম শ্রমিকের হাতে তুলে দিতে বিন্দুমাত্রও দ্বিধাবোধ করেননি। জামাতা করেছেন। সেই শ্রমিক হয়ে গেলেন এককালের বিশ্বনেতা। দেড় হাজার বছর আগেই একজন শ্রমিক থেকে বিশ্বনেতা তথা প্রেসিডেন্ট বানিয়ে দেওয়া কেবল ইসলামের পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল। তাঁর সমাজসংস্কার এমন এক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল, যার ফলে অহেতুক অহমিকার সব সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত ও ইমামগণও তাঁদের নিজেদের মূল নামের পাশাপাশি পেশাভিত্তিক পরিচয় দিতে বিন্দুমাত্রও লজ্জাবোধ করতেন না। ‘আত্তার’—অর্থাৎ আতর বিক্রেতা, কাত্তান (তুলা উৎপাদনকারী), খাব্বাজ (রুটি ব্যবসায়ী) ইত্যাদি পেশাভিত্তিক উপাধি ব্যবহার করতেন তাঁরা।

বৈধ কোনো পেশাই ছোট নয়—এই বাণীর মাধ্যমে কর্মের প্রতি মানুষের ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কারোর নিজ পিঠে কাঠের বোঝা বয়ে এনে বিক্রি করা কারো কাছে হাত পাতার চেয়ে উত্তম। তাকে (প্রার্থীকে) সে কিছু দিক বা না দিক।’ (বুখারি : ২/৭৩০) ভিক্ষার প্রতি নিরুৎসাহিত করে ভিক্ষার হাতগুলোকে শ্রমিকের হাতে রূপান্তর করেছেন হজরত মুহাম্মদ (সা.)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার সঙ্গে ওয়াদাবদ্ধ হবে যে সে কখনো ভিক্ষা করবে না, তার জান্নাতের ব্যাপারে আমি দায়িত্ব গ্রহণ করব।’ (আবু দাউদ : ২/৪২৭) উপার্জনের জন্য শ্রমে লিপ্ত থাকাকে তিনি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ বলে উল্লেখ করেছেন। এক লোক রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ দিয়ে গমন করলে সাহাবায়ে কেরাম লোকটির শক্তি, স্বাস্থ্য ও উদ্দীপনা দেখে বলতে লাগলেন, এই লোকটি যদি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে থাকত! রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘লোকটি যদি তার ছোট ছোট সন্তান অথবা তার বৃদ্ধ মাতা-পিতার জন্য উপার্জন কিংবা নিজেকে পরনির্ভরতা থেকে মুক্ত রাখতে উপার্জনের চেষ্টায় বেরিয়ে থাকে, তাহলে সে আল্লাহর পথেই রয়েছে।’ (হাইসামি : ৪/৩২৫) শ্রমিকের জন্য ক্ষমাপ্রাপ্তির ঘোষণাও করেছেন তিনি। একটি হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি শ্রমজনিত কারণে ক্লান্ত হয়ে সন্ধ্যা যাপন করে, সে ক্ষমাপ্রাপ্ত হয়েই তার সন্ধ্যা অতিবাহিত করে।’ (তাবরানি; ইসলামে শ্রমিকের অধিকার, পৃষ্ঠা-০২) একজন শ্রমিকের জন্য এর চেয়ে আশার বাণী আর কী হতে পারে!

শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যথাযথ মজুরিপ্রাপ্তি। মালিকগোষ্ঠী বরাবরই বিভিন্ন অজুহাতে শ্রমিকদের টাকা মেরে কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখে। ইসলামের ঘোষণা হলো, যারা শ্রমিকের পাওনা দিতে টালবাহানা করবে, হাশরের ময়দানে আল্লাহ নিজেই তাদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আমি কিয়ামতের দিন তিন শ্রেণির মানুষের প্রতিপক্ষ। আর আমি যার প্রতিপক্ষ, তাকে পরাজিত করবই। তন্মধ্যে এক শ্রেণি হলো, যে কোনো শ্রমিক নিয়োগ করে, অতঃপর তার থেকে পুরো কাজ আদায় করে নেয় কিন্তু তার পারিশ্রমিক প্রদান করে না।’ (বুখারি : ২/৭৭৬) শ্রমিকের পাওনা যথাসময়ে পরিশোধের ব্যাপারে মহানবী (সা.)-এর মতো এত কঠোর হুঁশিয়ারি আর কেউ উচ্চারণ করেননি। অনতিবিলম্বে মজুরি প্রদান করার ব্যাপারেও তিনি ছিলেন সবচেয়ে আন্তরিক। মজুরির প্রশ্নে মানবসভ্যতার ইতিহাসে শীর্ষে অবস্থান করছে তাঁর বাণী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করে দাও।’ (ইবনে মাজাহ : ২/৮১৭) মজুরির পক্ষে বিশ্বময় ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হওয়া তাঁর এই বাণী বাস্তবায়িত হলে এক দিনের জন্যও শ্রমিকদের কান্না শুনতে হতো না পৃথিবীবাসীকে।

সভ্যতার এ সময়েও পত্রিকার পাতা খুলতেই শ্রমিক নির্যাতনের খবর ভেসে ওঠে। কল-কারখানার শ্রমিক তো বটেই, গৃহের শ্রমিকও বাদ যাচ্ছে না নির্যাতন থেকে। ঠুনকো অভিযোগে শ্রমিককে মারধর করার অধিকার কিছুতেই দেয়নি ইসলাম। হজরত আবু মাসউদ (রা.) বলেন, আমি আমার চাকরকে মারধর করছিলাম। আমি পেছন থেকে আওয়াজ শুনতে পেলাম, ‘সাবধান আবু মাসউদ! তুমি তোমার গোলামের ওপর যতটুকু ক্ষমতা রাখো, আল্লাহ তোমার ওপর এর চেয়ে বেশি ক্ষমতা রাখেন।’ আমি পেছনে ফিরে দেখি, তিনি আমার প্রাণের নবী। আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমি তাকে আল্লাহর জন্য আজাদ করে দিলাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, তুমি যদি তাকে মুক্ত না করতে তবে অবশ্যই তোমাকে আগুনে জ্বলতে হতো। (মুসলিম : ৫/৯২) একজন কেনা গোলামের গায়ে হাত তোলায় নবীজি (সা.) কত বড় ধমক দিলেন! শ্রমিক কোনো ভুল করে ফেললেও তার জন্য ক্ষমার দরজা খোলা রেখেছে ইসলাম। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এক লোক এসে জিজ্ঞেস করল, ইয়া রাসুলুল্লাহ! শ্রমিককে কতবার ক্ষমা করব? নবীজি চুপ থাকলেন। লোকটি আবারও জিজ্ঞেস করলে নবীজি (সা.) চুপ থাকলেন। লোকটি তৃতীয়বার জিজ্ঞেস করলে নবীজি (সা.) বললেন, ‘প্রতিদিন ৭০ বার হলেও তার অপরাধ ক্ষমা করবে।’ (আবু দাউদ : ২/৭৬৩)

লেখক : খতিব, বাইতুশ শফীক মসজিদ

বোর্ড বাজার, গাজীপুর

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের ভূমিকা

R

ইসলাম মানবতার ধর্ম। মানবজাতির মধ্যে প্রচলিত সব ধরনের অন্যায়-অনাচার, অনিয়ম, হিংসা-বিদ্বেষ, সংঘাত ও রক্তপাত বন্ধের জন্য এবং মানবজাতির মধ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য পৃথিবীতে ইসলামের আবির্ভাব হয়েছে। পৃথিবীতে মানবজাতির আগমনের পর থেকে বিভিন্ন সময় তারা এক সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ পাককে ভুলে নানা প্রকার অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। মানবজাতির মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যুগে যুগে পথভ্রষ্ট জাতির মধ্যে আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ বা নবী-রাসুলগণ আগমন করেন।

সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় যেসব দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা মানবজাতির জন্য অনুকরণীয়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এমন একটি সময় আরব ভূমিতে আগমন করেছিলেন, যখন সেখানে কোনো আইনের শাসন ছিল না এবং অজ্ঞতা, বর্বরতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ছিল নিত্যমৈত্তিক ব্যাপার। সমাজে নারীদের অবস্থা আরো খারাপ ছিল। দারিদ্র্যের ভয়ে কন্যা সন্তানকে তারা জীবন্ত কবর দিত। আরবের এমন অজ্ঞতা ও অন্ধকার যুগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের মহান বাণী প্রচার করেন এবং আরব ভূমির সব নিপীড়িত মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেন।

মানবাধিকার সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াত

► নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ব্যতিরেকে কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন পৃথিবীর মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করল। (সুরা মায়েদা : ৩২)

► তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না। (সুরা বাকারা : ১২৮)

► তোমরা যখন মানুষের মধ্যে বিচারকার্য করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে করবে। (সুরা নিসা : ৫৮)

► নারীদের তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার আছে, যেমনি আছে তাদের পুরুষদের। (সুরা বাকারা : ২২৮)

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা.)

মহানবী (সা.) তাঁর জীবনে কয়েকটি কর্মের মাধ্যমে জাতি, ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সবার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় যে সফলতার পরিচয় দিয়েছেন, তার কোনো তুলনা হয় না। এ-সংক্রান্ত কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো।

হিলফুল ফুযুল : জাহেলি যুগের রক্তপাত, অন্যায় ও অনাচার বালক মুহাম্মদ (সা.)-এর মনে গভীর রেখাপাত করে। তিনি সমাজের সব অন্যায়, অবিচার ও নির্যাতন বন্ধের উপায় খুঁজে বের করার জন্য সর্বদা চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। অবশেষে তাঁর মনে একটি অভিনব চিন্তার উদয় হলো। ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি সমমনা নিঃস্বার্থ কিছু উৎসাহী যুবক ও পিতৃব্য যুবাইরকে নিয়ে একটি শান্তিসঙ্ঘ গঠন করেন। এ সংগঠন ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে পরিচিত। এ সংগঠন সমাজের সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। এর কর্মসূচিগুলো ছিল নিম্নরূপ—দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা; বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সদ্ভাব ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধ করা; অত্যাচারিতকে অত্যাচারীর হাত থেকে রক্ষা করা; দুর্বল, অসহায় ও এতিমদের সাহায্য করা; বিদেশি বণিকদের জান ও মালের নিরাপত্তা বিধান করা—সর্বোপরি সব ধরনের অন্যায় ও অবিচার অবসানের চেষ্টা করা।

মদিনা সনদ : মহানবী (সা.) ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলে সেখানকার অধিবাসীরা তাঁকে মদিনা প্রজাতন্ত্রের সভাপতি নির্বাচিত করেন। মদিনায় তখন মুসলমান, ইহুদি, খ্রিস্টান, পৌত্তলিকসহ অসংখ্য সম্প্রদায় ও গোত্রের লোক বাস করত। এসব জাতি ও সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তি, সম্প্রীতি ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি মদিনা সনদ নামে একটি সংবিধান প্রণয়ন করেন। এ সনদের প্রতিটি ধারায় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার গ্যারান্টি ছিল। এর উল্লেখযোগ্য ধারাগুলো হচ্ছে—

► মদিনা সনদে স্বাক্ষরকারী মুসলমান, ইহুদি, খ্রিস্টান, পৌত্তলিকসহ সব সম্প্রদায় একটি সাধারণ জাতি গঠন করবে এবং সব সম্প্রদায় সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে।

► হজরত মুহাম্মদ (সা.) নবগঠিত মদিনা প্রজাতন্ত্রের সভাপতি হবেন এবং পদাধিকারবলে তিনি মদিনার সর্বোচ্চ বিচারালয়ের প্রধান কর্তা হবেন।

► এ সনদে স্বাক্ষরকারী কোনো সম্প্রদায় শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হলে সমবেত শক্তি দিয়ে তা প্রতিহত করা হবে।

► প্রত্যেকের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে। মুসলমান ও অমুসলমান সম্প্রদায় নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।

► সনদে স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তা ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ জন্য তাঁর সম্প্রদায়কে দায়ী করা যাবে না।

► মদিনা নগরী আক্রান্ত হলে দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য সবাই যুদ্ধ করবে এবং প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ ব্যয়ভার বহন করবে।

► মদিনা নগরীকে পবিত্র বলে ঘোষণা করা হলো এবং এখানে রক্তপাত, হত্যা, বলাত্কার ও অপরাধমূলক কাজ নিষিদ্ধ করা হলো।

► দুর্বল ও অসহায়কে সাহায্য ও রক্ষা করতে হবে।

► অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করতে হবে এবং সব ধরনের পাপী ও অপরাধীকে ঘৃণার চোখে দেখতে হবে।

► নিজেদের মধ্যে অন্তর্বিরোধ দেখা দিলে হজরত মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর বিধান অনুযায়ী তা মীমাংসা করে দেবেন।

বিদায় হজের ভাষণ : মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের আগে তিনি সর্বশেষ যে হজ পালন করেন (৬৩২ খ্রিস্টাব্দে) সেটি বিদায় হজ নামে পরিচিত। এ হজের সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে আরাফাতের পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে সমবেত মুসলমানদের উদ্দেশে তিনি একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। এ ভাষণ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে বিবেচিত। মহানবী (সা.)-এর এ ঐতিহাসিক ভাষণের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বাণী তুলে ধরা হলো—

► হে ভক্তগণ, তোমাদের সহধর্মিণীদের ওপর তোমাদের যেরূপ অধিকার রয়েছে, তোমাদের ওপরও তাদের অধিকার তদ্রূপ। আল্লাহকে সাক্ষী রেখে তোমরা তাদের গ্রহণ করেছ এবং তাঁর আদেশমতো তাদের তোমাদের জন্য বৈধ করে নিয়েছ। তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবে।

► সর্বদা অন্যের আমানত হেফাজত করবে ও পাপকার্য এড়িয়ে চলবে।

► আইয়ামে জাহেলিয়া যুগ বা কুসংস্কারাচ্ছন্ন আরব জাতির ‘রক্তের বদলে রক্ত’নীতি এখন থেকে নিষিদ্ধ হলো।

► আইয়ামে জাহেলিয়াতের কুসিদপ্রথা বা সুদ নেওয়া রহিত হলো।

► দাস-দাসিদের সঙ্গে তোমরা হূদ্যতাপূর্ণ ব্যবহার করবে। তাদের নির্যাতন করার কোনো অধিকার তোমাদের নেই। তোমরা যা আহার করো, যে বস্ত্র পরিধান করো, তাদেরও অনুরূপ খাদ্য ও বস্ত্র দান করবে। তারা যদি ক্ষমার অযোগ্য কোনো ব্যবহার করে, তা হলেও তাদের মুক্তি দান করবে। স্মরণ রেখো, তারাও আল্লাহর সৃষ্ট ও তোমাদের মতো।

► হুঁশিয়ার, তোমরা আল্লাহর সঙ্গে কাউকেও অংশীদার করবে না, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করবে না এবং কখনো ব্যভিচারে লিপ্ত হবে না।

► হে মানুষগণ, আমার বাণী মনোযোগসহকারে অনুধাবন করতে চেষ্টা করো। স্মরণ রেখো, সব মুসলমান পরস্পরের ভাই ভাই এবং তোমরা একই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। সমগ্র দুনিয়ার সব মুসলিম একই অবিচ্ছেদ্য ভ্রাতৃসমাজ। অনুমতি বাদে কেউ কারো কোনো কিছু জোর করে কেড়ে নিতে পারবে না।

► স্মরণ রেখো, বাসভূমি ও বর্ণনির্বিশেষে প্রত্যেক মুসলমান সমপর্যায়ভুক্ত। আজ থেকে বংশগত কৌলীন্যপ্রথা বিলু্প্ত হলো। সে-ই তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে কুলীন, যে স্বীয় কাজের দ্বারা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করবে।

► সাবধান! ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কোরো না। এ বাড়াবাড়ির ফলে অতীতে বহু জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।

► হুঁশিয়ার! নেতৃত্বের আদেশ কখনো লঙ্ঘন কোরো না। যদি কোনো ক্রীতদাসকেও তোমাদের আমির করে দেওয়া হয় এবং সে যদি আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের চালনা করে, তবে অবনত মস্তকে তার আদেশ মেনে চলবে।

কুসংস্কার দূরীকরণ ও শিশুর মর্যাদা

প্রতিষ্ঠা : ইসলামের আবির্ভাবের আগে আরবে দারিদ্র্য ও লজ্জার ভয়ে শিশু কন্যা হত্যার প্রচলন ছিল। মুহাম্মদ (সা.) শিশু কন্যা হত্যার এ জঘন্য প্রথা বন্ধ করেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের শিশুদের হত্যা কোরো না।’ তিনি নারীদের সামাজিক মর্যাদা দানের জন্য কন্যা সন্তানের জন্মকে অভিশাপ হিসেবে না দেখার জন্য আরববাসীর উদ্দেশে বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যার প্রথম সন্তান মেয়ে।’ আজকের শিশু আগামী দিনের দেশ গঠনের সুনাগরিক। তিনি সব শিশুকে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।

আধুনিক যুগে মানবাধিকার : পাশ্চাত্য সভ্যতায় মানবাধিকারের ধারণাটি প্রথম জন্ম হয় ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। এর ফলে ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে সর্বপ্রথম ঘোষিত হয় Declaration of the People’s Right এবং ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে সংযোজিত হয় The Bill of Rights. এর পর থেকে মানবাধিকারের ধারণাটি সমগ্র পাশ্চাত্য দেশে বিকশিত হয় এবং ধীরে ধীরে তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানবাধিকার প্রসঙ্গটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হতে থাকে। এর ফলে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ কর্তৃক ৩০টি ধারাসংবলিত সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ ঘোষিত হয়। এ ঘোষণায় বিশ্ববাসীর মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদটি কোনো রাষ্ট্রের ওপর বাধ্যতামূলক করা না হলেও ক্রমান্বয়ে তা বিভিন্ন দেশে অনুসৃত হতে থাকে। আজ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই গঠিত হয়েছে মানবাধিকার কমিশন। এসব কমিশন নিজ নিজ দেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছে। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি আজ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা যেন ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পৃথিবীর সর্বত্র ক্রমাগত ঘটেই চলছে। আজকের আধুনিক সভ্য যুগে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের সরকারকে যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে মহানবী (সা.) অজ্ঞতা ও অন্ধকার যুগে কলুষিত সমাজে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় শতভাগ সফল হয়েছিলেন।

মুসলমানরা উত্তর আফ্রিকায় সাম্রাজ্য বিস্তার করলে সেখানকার বারবার জাতির মতো দুর্ধর্ষ ও হিংস্র জাতির মধ্যেও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। ৭১১ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানরা স্পেন বিজয় করলে ইউরোপ ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত সামন্ত রাজাদের দুঃশাসন ও অত্যাচারের হাত থেকে সেখানকার সাধারণ মানুষ মুক্ত হয়। তারা ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

এ ছাড়া মধ্য এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক অবস্থা, ধর্মীয় গোঁড়ামি, বর্ণবাদ ও কুসংস্কার দূরীকরণেও ইসলামের ভূমিকা অপরিসীম। অর্থাৎ ইসলাম ধর্ম যখন যেখানে বিস্তৃত হয়েছে, সেখানেই সব অনাচার, কুসংস্কার, বৈষম্য ইত্যাদি দূরীভূত হয়েছে এবং মানুষ তাঁর ন্যায্য অধিকার ভোগ করেছে। ইসলামই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সফলতা লাভ করেছে। আজও ইসলামী রীতিনীতি অনুসরণ ও পালনের মাধ্যমেই পৃথিবীর বুকে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ,সরকারি বাঙ্লা কলেজ, ঢাকা

পহেলা বৈশাখ বাঙালির ঐতিহ্য

iguh

স্বাগত বাংলা নববর্ষ ১৪২৩। বিস্মৃতির অতলে লুকিয়ে থাকা সত্য হলো—বাংলা সনের ক্রমবিবর্তনের ইতিহাসে রয়েছে মুসলিম ঐতিহ্য। ‘সন’, ‘তারিখ’ আরবি শব্দ আর ‘সাল’ ফারসি শব্দ স্মরণ করিয়ে দেয় বাংলা সনের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পৃক্ততা। কেননা ইবাদতের প্রয়োজনে চান্দ্রমাসের হিসাব রাখা ফরজে কিফায়া। স্বভাবত মানুষ উল্লেখযোগ্য ঘটনা স্মরণ করে সময়-তারিখ বলে; যেমন সংগ্রামের বছর, বড়পানি বা বন্যার বছর, আকালের বছর। আবিসিনিয়ায় আবরাহার হস্তীবাহিনী ধ্বংস হওয়ার ফলে চালু হয় ‘হস্তীবর্ষ’। ইতিহাসে দেখা যায় বিশেষ ঘটনাকেন্দ্রিক সন ব্যবস্থার প্রচলন। যেমন—হজরত ঈসা (আ.)-এর স্মরণে খ্রিস্টবর্ষ। প্রিয় নবী (সা.)-এর হিজরতের ঘটনার ১৭ বছর পর হজরত ওমর (রা.) হিজরি সন প্রবর্তন করেন।

বাংলা নববর্ষ পালনে ইরান ও আরবের বিভিন্ন দেশের নববর্ষ উদ্যাপন ‘নওরোজ’ অনুষ্ঠানের যোগসূত্র লক্ষণীয়। ১২০১ খ্রিস্টাব্দ, ৫৯৮ হিজরি মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের ফলে হিজরি সন রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পায়। তখন চান্দ্র ও সৌরবর্ষের গণনারীতিতে পার্থক্যে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। কারণ সূর্য নিজ কক্ষপথে ঘুরতে সময় লাগে প্রায় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। যা হলো সৌরবর্ষ। আবার চন্দ্রকলার হ্রাস-বৃদ্ধিতে সময় লাগে প্রায় ২৯ দিন ১২ ঘণ্টা। যে কারণে এক চান্দ্রবছর হতে সময় লাগে প্রায় ৩৫৪ দিন ৮ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট।

মোগল সম্রাট আকবরের শাসনামলে ‘উশর’ ও ‘খারাজ’ তথা মুসলমানদের ফসলি কর ও অমুসলিমদের ভূমি কর আদায়ের ক্ষেত্রে চান্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষের গণনারীতির ব্যবধানে তৈরি হয় জটিলতা। কেননা ওই দুই বর্ষপরিক্রমায় তৈরি হয় ১১ দিন ব্যবধান এবং ৩৩ বছরে পার্থক্য হয় এক বছর! বাস্তবে দেখা গেল, হিজরি সালের হিসাবে যখন কর আদায়ের সময়, তখন কৃষকের মাঠে ফসলও থাকত না।

‘মুসলিম ফসলি সন’ প্রবর্তনের আগে অগ্রহায়ণ থেকে বছর গণনা হতো। ‘অগ্র’ অর্থ শুরু, ‘হায়ণ’ অর্থ বছর। অন্য মতে, ‘অগ্র’ অর্থ শ্রেষ্ঠ, ‘হায়ণ’ অর্থ ধান। কেননা এ সময় প্রধান ফসল আমন বা শ্রেষ্ঠ ‘হৈমন্তিক’ ধান কৃষকের ঘরে ওঠত। তবে বর্ষা শেষে খাজনা আদায়কারী কর্মচারীদের অসুবিধা বিবেচনায় তা শুষ্ক মৌসুমে আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়। তখন রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে হিজরি সনের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে সম্রাট আকবরের সভাসদ আমির ফতেহউল্লাহ সিরাজি একটি নতুন সৌর সন উদ্ভাবন করেন। তিনি হিজরির ৩৫৪ দিনের পরিবর্তে ৩৬৫ দিন ধরে যে নতুন সন উদ্ভাবন করেন, তা-ই ‘বাংলা সন’ হিসেবে প্রচলিত। সম্রাট আকবর ফরমান জারির মাধ্যমে এই নতুন সন গণনা করেন এবং সূচনা বছর হিসেবে ধরা হয় তাঁর মসনদে আরোহণের বছর ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯৬৩ হিজরিকে। দেখা যায়, আকবরের ‘ফসলি সন’ যখন চালু হয়, তখন সুবে বাংলায় মহররমে ছিল বৈশাখ মাস। সে জন্যই নতুন সনের প্রথম মাস হয়ে গেল বৈশাখ মাস। অন্যদিকে চান্দ্রবর্ষ ও সৌরবর্ষের গণনারীতির ব্যবধানে কালের বিবর্তনে দেখা যাচ্ছে এখন হিজরি ১৪৩৭ এবং ১৪ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ পহেলা বৈশাখ ১৪২৩ সাল। এ থেকে জানা যায়, আমাদের বাংলা নববর্ষে ঐতিহাসিক হিজরত ও হিজরি সনের স্মৃতি মিশে আছে।

১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে ‘যুক্তফ্রন্ট সরকার’ ক্ষমতায় এলে এ কে ফজলুল হক বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করেন এবং দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। বঙ্গাব্দের সূচনা ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ ঠিক রাখার জন্য বাংলা একাডেমির পক্ষে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বছরের শুরুর পাঁচ মাস ৩১ দিন এবং শেষ মাসগুলো ৩০ দিন নির্ধারণ করেন এবং আশির দশকে বাংলা একাডেমি ৮ ফাল্গুন ২১ ফেব্রুয়ারি ও ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ ঠিক রাখার জন্য খ্রিস্টাব্দের সঙ্গে মিলিয়ে অধিবর্ষ নির্ধারণ করে ফাল্গুন মাস ৩১ দিন প্রচলন করেন। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে সাংবাদিক বোরহান আহমেদের প্রস্তাবে রমনায় ‘পান্তা-ইলিশ’ এবং ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে চারুকলার আনন্দ মিছিলকে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে প্রথম প্রচলন করা হয়।

পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের এমনি উৎসব—যা ধর্ম, সমাজ, বয়স ও বৃত্তির সীমা পেরিয়ে সর্বত্র একাকার। এদিনে আমাদের করণীয় হলো—নববর্ষকে আল্লাহর নিয়ামত মনে করে শুকরিয়া আদায় করা। নববর্ষের আনন্দ দুস্থ-দরিদ্রদের সঙ্গে ভাগ করা। নববর্ষে অভাবী মানুষের খোঁজ-খাতির, তাদের খাদ্য, পোশাক দান করা। পহেলা বৈশাখ নতুন আঙ্গিকে জীবন গড়ার শপথের দিন। পহেলা বৈশাখ রাষ্ট্রীয় কর পরিশোধের অঙ্গীকার গ্রহণের দিন। পহেলা বৈশাখ দেনা-পাওনা ঁঢ় ঃড় ফধঃব বা হালনাগাদ করার দিন। পহেলা বৈশাখ পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টির প্রেরণার দিন। ফসলি কর পরিশোধের সঙ্গে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাবোধ জাগানোর দিন হতে পারে।

ইসলামে নির্দোষ বিনোদন, উত্পাদনমুখী তত্পরতা সমর্থিত। পহেলা বৈশাখের অনুষঙ্গ ‘হালখাতা’। উদ্দেশ্য ছিল ‘উশর’, ‘খারাজ’ বা ফসলি কর পরিশোধের আনন্দ প্রকাশ করা এবং ব্যবসায়ের হিসাব ও খাজনা ‘রাজকীয় খাতায় হালনাগাদ’ বা ঁঢ় ঃড় ফধঃব রাখা। এ উপলক্ষে রাজা-জমিদারকে প্রজারা তাদের সৃজনশীল পণ্য, সূচিকর্ম উপহার দিত। রাজা-জমিদাররাও প্রজাদের ‘কর রেয়াত’ ও ‘ইনাম’ দিতেন। মানুষের নৈপুণ্য প্রদর্শন ও সাংবাৎসরিক প্রয়োজনীয় অথবা শৌখিন পণ্যের বেচাকেনার জন্য বৈশাখী মেলা লোকবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য। মেহনতি কৃষক খাজনা আদায়ের আগ্রহে বলত, ‘আর কটা দিন সবুর কর রসুন বুনেছি…’; কিন্তু বর্তমানে তা হয়েছে এক দিনের সস্তা বিনোদনসর্বস্ব বিষয়। নববর্ষের গর্বিত অতীত ভুলে পালিত হয় শহুরে ঘরানায়। এতে নেই মেঠো বাঙালির ‘সোনা ছোঁয়া মাটির’ সৌরভ। বরং ব্যান্ড ও ব্র্যান্ডিংয়ের কল্যাণে বসছে বাণিজ্যিক পসরা। হাড়ভাঙা শ্রমে ক্লান্ত যে কৃষক ঋণে জর্জরিত, তার কাছে বাংলা নববর্ষের আবেদন কতটুকু? অন্যদিকে খাদ্যের সঙ্গে মিশে থাকা চুল, কাঁকরজাতীয় বস্তু যেমন অখাদ্য, তেমনি সংস্কৃতির মধ্যে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশই বা কতটা যৌক্তিক? বর্তমানে তো তাই—“বোশেখ মানে—/ছোট নদীর হাঁটু জল; জমবে মেলা বটতলা হাট খলা।/উদাসী মন, পাগলা হাওয়া—/তাঁতের শাড়ি-পাঞ্জাবি, পাশাপাশি বাদাম খাওয়া।/বোশেখ মানে—আনমনে গান গাওয়া, ‘না বলা কথা’ বলে ফেলা।”

স্মরণ রাখতে হবে, উৎসবের আবহে নারী-পুরুষের অবাধ-অবাধ্য মেলামেশা ইসলামে অনুমোদিত নয়। ‘চোখের হেফাজত’ খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহর নির্দেশ : ‘হে রাসুল (সা.)! মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে।’ (সুরা নুর : ৩০) পর্দা বজায় রাখা নারী-পুরুষ সবার জন্যই সার্বক্ষণিক বাধ্যতামূলক বিধান। আর বিনোদন যেন অপচয়ের কারণ না হয়, তা-ও খেয়াল রাখা জরুরি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর কিছুতেই অপব্যয় করবে না। যারা অপব্যয় করে, তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ২৬, ২৭)

লেখক : বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর

বাঙালি মুসলমানের স্বাধীনতাসংগ্রাম

এ পৃথিবীতে কেউ পরাধীন থাকতে চায় না। মুক্ত বিহঙ্গের মতো দুই ডানা মেলে আকাশে উড়তে চায়, ঘুরতে চায়। স্বাধীনতা মানবজীবনে মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। মহান আল্লাহ মানুষকে স্বাধীনসত্তা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। আর তাঁর স্বাধীন বিচরণক্ষেত্র হিসেবে বিস্তৃত পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন। স্বাধীনতা মানে কী? বাংলা একাডেমির অভিধান মতে, স্বাধীন—১. বাধাহীন, আজাদ, মুক্ত, স্বচ্ছন্দ। ২. নিজের বশে, অনন্য নির্ভর। ৩. সার্বভৌম, বিদেশি দ্বারা শাসিত নয় এমন। স্বাধীনতা—১. স্বচ্ছন্দতা, বাধাহীনতা। ২. আজাদি। কাজেই স্বাধীন বাংলাদেশ মানে বিদেশিদের দ্বারা শাসিত নয়, এমন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বাঙালি স্বাধীনচেতা জাতি। তাদের রক্তে-মাংসে স্বাধীনতার বীজ বপন করা হয়েছে। হাজার বছরের ইতিহাস সাক্ষী, বাঙালি জাতি কখনো বিদেশিদের শাসন মেনে নেয়নি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি চেয়েছিল। স্বাধীন মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাই তাদের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে অনুপ্রাণিত করেছিল। ’৭১-এ ইসলাম রক্ষার নামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরপরাধ বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুসলমানদের তারা নির‌্যাতন করত ‘বিধর্মী’ আখ্যা দিয়ে। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখেছেন : ‘কুমিল্লার নবম ডিভিশন হেডকোয়ার্টারে আমার সফরকালে আমি দেখেছি, পাঞ্জাবি অফিসাররা বাঙালিদের ইসলামের আনুগত্যের প্রতি সব সময়ই সন্দেহ পোষণ করত। তারা বাঙালি মুসলমানদের কাফির ও হিন্দু বলত।’ (দ্য রেইপ অব বাংলাদেশ, পৃ. ২৪) মূলত ’৭১-এ ইসলাম ও মুসলমানরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম লিখেছেন—‘এক মহিলা রোগীর কাছে শুনেছিলাম, তিনি নামাজ পড়ছিলেন, সে অবস্থায় তাঁকে টেনে রেইপ করা হয়। আরেক মহিলা কোরআন শরিফ পড়ছিলেন, শয়তানরা কোরআন শরিফ টান দিয়ে ফেলে তাঁকে রেইপ করে।’ (একাত্তরের দিনগুলি, পৃ. ১২৩)

স্বাধীনতার যুদ্ধে শরিক ছিলেন দেশের শ্রদ্ধাভাজন আলেম সমাজও। সৈয়দ আবুল মকসুদের ভাষায়, ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আলেম-ওলামা ও মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভূমিকা স্মরণীয়। পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ঘাতক দালাল, রাজাকার, আলবদর প্রভৃতি অন্য এক প্রজাতি। তারা ঘৃণার পাত্র। আলেম-ওলামারা ধর্ম-নির্বিশেষে সব মানুষেরই অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন।’ (সৈয়দ আবুল মকসুদের কলাম, ‘দ্য সুপ্রিম টেস্ট’, প্রথম আলো (০৭-০৪-১৩ ইং)

স্বাধীনতাসংগ্রামে সংগঠকের ভূমিকায়ও আলেম সমাজের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। এখানে আমরা স্মরণ করতে পারি মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের কথা। মাওলানা তর্কবাগীশ ছিলেন ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় পড়া কওমি ঘরানার একজন আলেম। তিনি ছিলেন একাধারে একজন বিজ্ঞ সংগঠক ও যোদ্ধা। তাঁর সম্পর্কে ডক্টর মুহাম্মদ আবদুল্লাহ লিখেছেন, বাংলদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে (১৯৭১ খ্রি.) মাওলানা তর্কবাগীশ উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। তিনি ‘ওলামা পার্টি’ গঠন করে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করেন। তিনি ছিলেন ওই পার্টির সভাপতি। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের গণপরিষদের প্রথম বৈঠকে মাওলানা তর্কবাগীশ সভাপতিত্ব করেন। এখান থেকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। তাঁর সভাপতিত্বেই সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার প্রমুখ নির্বাচিত হন—(রাজনীতিতে বঙ্গীয় ওলামার ভূমিকা, পৃষ্ঠা নম্বর ২০৪)

সুতরাং আমরা বাঙালি, নাকি মুসলমান—এ বিতর্ক অর্থহীন। আগে বাঙালি, নাকি আগে মুসলমান—এ বিতর্কেরও যৌক্তিকতা নেই। এটাই সত্য যে আমরা একই সঙ্গে বাঙালি ও মুসলমান। আহমদ ছফা লিখেছেন : ‘বেশ কিছুদিন ধরে একটা অশুভ বিতর্ক আমাদের দেশে চলে আসছে। আমরা বাংলাদেশি না বাঙালি? আমরা মুসলমান, না শুধু বাঙালি? এগুলো আসলে বিতর্কের বিষয় হওয়া উচিত ছিল না। আমরা যেমন বাংলাদেশি তেমনি আমরা বাঙালিও বটে। আমাদের মুসলমান পরিচয় বাঙালি পরিচয়কে যেমন খারিজ করে না, তেমনি বাঙালি পরিচয়ও মুসলমান পরিচয়কে খারিজ করে না।’ (সূত্র : আহমদ ছফা, নির্বাচিত প্রবন্ধ, মাওলা ব্রাদার্স, তৃতীয় মুদ্রণ, পৃ. ২৫৯-২৬০)

বাংলাদেশের সংবিধানের চার মূলনীতিতে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ কথাটা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। এর ব্যাখ্যা বঙ্গবন্ধু নিজেই দিয়ে গেছেন। সেই ব্যাখ্যা উপেক্ষা করে মুসলমানদের ওপর ধর্মহীনতা চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন : ‘‘বাংলাদেশের যে ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ ঘোষিত হলো তা ইসলামহীন সেক্যুলারিজম নয়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ইসলামসংক্রান্ত অনুষ্ঠান একটু বেশিই যেন প্রচারিত হতো। হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে বিশেষ কিছুই হতো না। কিন্তু কেন তা হতো? তা হতো এ জন্য যে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান শ্রোতার কাছে ইসলামী অনুষ্ঠানের বিশেষ আবেদন ছিল। যার বিশেষ আবেদন থাকে, তার প্রয়োজন অস্বীকার করা যায় না। বাংলাদেশ কি সেদিন ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হতে চেয়েছিল নাকি অসাম্প্রদায়িক হতে চেয়েছিল? সেদিন বাংলাদেশের ধর্মাবলম্বী নির্বিশেষে বাঙালি জনগণ চেয়েছিল অতীতের সাম্প্রদায়িক বিষ ধুয়ে-মুছে একটি সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতিপূর্ণ, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে—সেক্যুলার হতে নয়।’’ (সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত বেহাত বিপ্লব ১৯৭১, আগামী প্রকাশনী, দ্বিতীয় সংস্করণ, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ডিসেম্বর ২০১৩, পৃ. ২২৮)

এটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার যে ১৯৭১ সালের যুদ্ধ ইসলামের বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল জালিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘মোনাফিকদের ক্ষমা নেই’ শীর্ষক একটি সরকারি প্রচারপত্রের শেষে লেখা ছিল, “আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ‘সত্যের জয় ও মিথ্যার বিনাশ অবশ্যম্ভাবী।’ বাঙালি এতে সম্পূর্ণ বিশ্বাসী।” (সূত্র : বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ : দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ড, পৃ. ৩৩৩-৩৩৬) এই প্রচারপত্রে ফুটে উঠেছে যে ইমানি প্রেরণা নিয়েই মুসলমানরা ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করেছে। যারা এ নিয়ে তর্ক করতে চায়, তারা আসলে বিভ্রান্তির শিকার। এ বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল স্বাধীনতার পরই, মুষ্টিমেয় লোকের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে এই বিভ্রান্তির ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু স্বদেশে ফিরে এসে এই বিভ্রান্তি দূর করেন। আবুল মনসুর আহমদের ভাষায়, “এখানে শুধু এইটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে একটা বিভ্রান্তি সত্যই সৃষ্টি হইয়াছিল। সেই বিভ্রান্তি পাকিস্তানের পরিণাম, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জাতীয় স্বকীয়তা, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদি সকল ব্যাপারে পরিব্যাপ্ত ছিল। ফলে তাদের মধ্যে এমন ধারণাও সৃষ্টি হইয়াছিল যে নিজেদের ‘মুসলমান’ ও নিজেদের রাষ্ট্রকে ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ বলিলে সাধারণভাবে হিন্দুরা বিশেষভাবে ভারত সরকার অসন্তুষ্ট হইবেন।…

শেখ মুজিবের প্রত্যাবর্তন এক মুহূর্তে এই কুয়াশা দূর করিয়া দিয়াছিল। ১০ই জানুয়ারির ওই একটি মাত্র বক্তৃতার তুফানে বাংলাদেশের আসমান হইতে ওই বিভ্রান্তিকর কালো মেঘ মিলাইয়া গিয়াছিল। শেখ মুজিব তাঁর বক্তৃতায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ এবং আশু প্রয়োজনীয় ঘোষণা করিয়াছিলেন : ১. আমি মুসলমান, আমার বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র; (২) আমাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আমি মি. ভুট্টোর কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু সে কৃতজ্ঞতার দরুন আমি দুই অঞ্চল মিলিয়া এক পাকিস্তান রাখিবার তাঁর অনুরোধ রাখিতে পারিলাম না। বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রই থাকিবে; (৩) তাঁদের সৈন্যবাহিনী বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে অকথ্য জুলুম করিয়াছে, দুনিয়ার ইতিহাসে তার তুলনা নাই। …শেখ মুজিবের এই তিনটি ঘোষণাই জনগণের অন্তরের কথা ছিল। বিপুল হর্ষধ্বনি করিয়া সেই বিশাল জনতা শেখ মুজিবের উক্তি সমর্থন করিয়াছিল।” (আবুল মনসুর আহমদ, আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, খোশরোজ কিতাব মহল, বাংলাবাজার, ঢাকা; পুনর্মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি, ২০১০, পৃ. ৬০৪-৬০৫)

আবুল মনসুর আহমদ আরো লিখেছেন : “এই সব বিভ্রান্তির মধ্যে প্রধান এই : ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতায় পাকিস্তান ভাঙিয়া গিয়াছে; ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ মিথ্যা প্রমাণিত হইয়াছে।’ এটা সাংঘাতিক মারাত্মক বিভ্রান্তি।… অথচ প্রকৃত অবস্থাটা এই যে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় পাকিস্তানও ভাঙে নাই; ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ও মিথ্যা হয় নাই। এক পাকিস্তানের জায়গায় লাহোর প্রস্তাবের মতো দুই পাকিস্তান হইয়াছে।… পশ্চিমা জনগণ তাদের রাষ্ট্র—নাম রাখিয়াছে ‘পাকিস্তান’। আমরা পূরবীরা রাখিয়াছি বাংলাদেশ। এতে বিভ্রান্তির কোনো কারণ নাই।” (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃ. ৬৩২, ৬৩৪)

লেখক : ইতিহাস গবেষক

জান্নাতি পুরুষেরা পাবে ৭০ টি হুর,,, কিন্তু নারীরা কি পাবে ? (ভিডিও সহ)

জান্নাতে পুরুষেরা ৭০ জন হুর পাবে। কিন্তু নারীর জন্য কি আছে? বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই এই প্রশ্নের উত্তরে যেটা পাওয়া যায় তা হল, নারীরা তার (দুনিয়ার) স্বামীকে পাবে। পুরুষের জন্য ৭০ জন হুর আর নারীর জন্য দুনিয়ার স্বামী। নারীদের ভাগে তো কম দেওয়া হয়ে গেল। এর চেয়ে বড় প্রশ্ন হল, ৭০ জন হুরের কাছে নিজের স্বামী যাচ্ছে, এটা একজন নারী কিভাবে মেনে নিবে? দুনিয়াতে নারীরা তো বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই বঞ্চিত। জান্নাতেও কি তারা বঞ্চিত হবে?

বিষয়টি বুঝতে গেলে প্রথমে বুঝতে হবে, কোন চরিত্রের লোকেরা জান্নাতে যাবে। যখন আদম-হাওয়াকে দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছিল তখন দুনিয়াটা স্বর্গের মতনই ছিল। কোলাহল, পরিবেশ দুষন, রোগ বালাই, হিংসা, চুরি, ডাকাতি, মারামারী, খুন, ধর্ষন এসব কিছুই ছিল না। ধীরে ধীরে মানুষ দুনিয়াকে আজকের মতন বানিয়ে ফেলেছে। দুনিয়া তো ক্ষনস্থায়ী, জান্নাত অনন্তকালের জন্য। দুনিয়ার সব মানুষকে যদি একসাথে জান্নাতে ঢোকানো হয় তাহলে ওখানের পরিবেশ নস্ট করে ফেলতে বেশীদিন লাগবে না। একজন আরেকজনের জমি দখল করবে, একজন আরেকজনের হুরকে ধর্ষন করবে, ইত্যাদি। কে কি করবে এটা দেখানোর জন্যই আমাদের দুনিয়ার জীবন। দুনিয়াতে যাদের আকাম করে অভ্যাস আছে তারা জান্নাতে গেলেও আকামই করবে। এজন্যই বাছাই করা , সৎ চরিত্রের, আকাম-কুকাম মুক্ত লোকই জান্নাতে প্রবেশ করবে। যদিও জান্নাতে প্রবেশের প্রথম শর্ত হল ঈমান। আর ঈমানদার লোক অসত চরিত্রের হয় না। জান্নাতের নারী পুরুষ উভয়েই হবে উত্তম চরিত্রের অধিকার।

যে ১৪টি আমলে আপনার রিজিক- ধন – দৌলত বাড়বে – জেনে নিন

মুসলিম মাত্রই বিশ্বাস করেন যে তার আয় ও উপার্জন, জীবন ও মৃত্যু, এবং সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য ইত্যাদি র্নিধারণ হয়ে যায় যখন তিনি মায়ের উদরে থাকেন। আর এসব তিনি লাভ করেন তার জন্য বরাদ্দ উপায়-উপকরণগুলোর মাধ্যমে। তাই আমাদের কর্তব্য হলো হাত গুটিয়ে বসে না থেকে এর জন্য র্নিধারিত উপায়-উপকরণ সংগ্রহে চেষ্টা করা। যেমন চাষাবাদ, ব্যবসায়-বাণিজ্য, শিল্প-চারু, চাকরি-বাকরি বা অন্য কিছু।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿هُوَ ٱلَّذِي جَعَلَ لَكُمُ ٱلۡأَرۡضَ ذَلُولٗا فَٱمۡشُواْ فِي مَنَاكِبِهَا وَكُلُواْ مِن رِّزۡقِهِۦۖ وَإِلَيۡهِ ٱلنُّشُورُ ١٥﴾ [الملك: ١٥] ‘তিনিই তো তোমাদের জন্য যমীনকে সুগম করে দিয়েছেন, কাজেই তোমরা এর পথে-প্রান্তরে বিচরণ কর এবং তাঁর রিযক থেকে তোমরা আহার কর। আর তাঁর নিকটই পুনরুত্থান।’ {সূরা আল-মুলক, আয়াত : ১৫}

রিজিক বৃদ্ধির উপায়সমূহের মধ্যে কুরআন ও হাদীস উল্লেখিত ১৪টি আমল :

প্রথম আমল : তাকওয়া ও তাওয়াক্কুল অবলম্বন করা
আল্লাহর ভয় তথা তাকওয়া অবলম্বন করা, তাঁর নির্দেশাবলি পালন ও নিষিদ্ধ বিষয়গুলো বর্জন করা। পাশাপাশি আল্লাহর ওপর অটল আস্থা রাখা, তাওয়াক্কুল করা এবং রিজিক তালাশে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করা। কারণ, যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান।
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,

﴿ وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجۡعَل لَّهُۥ مَخۡرَجٗا ٢ وَيَرۡزُقۡهُ مِنۡ حَيۡثُ لَا يَحۡتَسِبُۚ وَمَن يَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِ فَهُوَ حَسۡبُهُۥٓۚ إِنَّ ٱللَّهَ بَٰلِغُ أَمۡرِهِۦۚ قَدۡ جَعَلَ ٱللَّهُ لِكُلِّ شَيۡءٖ قَدۡرٗا ٣ ﴾ [الطلاق : ٢، ٣]

‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরী করে দেন। এবং তিনি তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দিবেন যা সে কল্পনাও করতে পারবে না। আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে আল্লাহ তার জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ তাঁর উদ্দেশ্য পূর্ণ করবেনই। নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের জন্য একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।’ {সূরা আত-তালাক, আয়াত : ২-৩}

অর্থাৎ যে আল্লাহকে ভয় করবে এবং আনুগত্য দেখাবে, আল্লাহ তার সকল সংকট দূর করে দেবেন এবং তার কল্পনাতীত স্থান থেকে রিজিকের সংস্থান করে দেবেন। আর যে কেউ তার উদ্দেশ্য হাসিলে একমাত্র আল্লাহর শরণাপন্ন হয় তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। বলাবাহুল্য এই তাকওয়ার পরিচয় মেলে হালাল উপার্জনে চেষ্টা এবং সন্দেহযুক্ত কামাই বর্জনের মধ্য দিয়ে।

দ্বিতীয় আমল : তাওবা ও ইস্তেগফার করা
অধিক পরিমাণে ইস্তেগফার এবং বেশি বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও রিজিক বাড়ে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর অন্যতম নবী ও রাসূল নূহ আলাইহিস সালামের ঘটনা তুলে ধরে ইরশাদ করেন,

﴿ فَقُلۡتُ ٱسۡتَغۡفِرُواْ رَبَّكُمۡ إِنَّهُۥ كَانَ غَفَّارٗا ١٠ يُرۡسِلِ ٱلسَّمَآءَ عَلَيۡكُم مِّدۡرَارٗا ١١ وَيُمۡدِدۡكُم بِأَمۡوَٰلٖ وَبَنِينَ وَيَجۡعَل لَّكُمۡ جَنَّٰتٖ وَيَجۡعَل لَّكُمۡ أَنۡهَٰرٗا ١٢ ﴾ [نوح: ١٠، ١٢] ‘আর বলেছি, ‘তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল’। (তাঁর কাছে ক্ষমা চাইলে) ‘তিনি তোমাদের উপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, ‘আর তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান- সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দেবেন আর দেবেন নদী-নালা’। {সূরা নূহ, আয়াত : ১০-১২}

হাদীসে বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করে বলা হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
্র مَنْ لَزِمَ الاِسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَمِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لاَ يَحْتَسِبُ গ্ধ.
‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার করবে আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের সংস্থান করে দেবেন।’ [আবূ দাঊদ : ১৫২০; ইবন মাজা : ৩৮১৯; তাবরানী : ৬২৯১][১] অন্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

্র مَنْ أَكْثَرَ الِاسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا وَمِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لاَ يَحْتَسِبُগ্ধ.
‘যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তেগফার করবে আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেবেন।’ [বাইহাকী : ৬৩৬; হাকেম, মুস্তাদরাক : ৭৬৭৭ সহীহ সূত্রে বর্ণিত।]

তৃতীয় আমল : আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা
আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের হক আদায়ের মাধ্যমেও রিজিক বাড়ে। যেমন : আনাস ইবন মালেক রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি তিনি ইরশাদ করেন,
্র مَنْ سَرَّهُ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ أَوْ يُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ فَلْيَصِلْ رَحِمَهُগ্ধ.
‘যে ব্যক্তি কামনা করে তার রিজিক প্রশস্ত করে দেওয়া হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ করা হোক সে যেন তার আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে।’ [বুখারী : ৫৯৮৫; মুসলিম : ৪৬৩৯]

চতৃর্থ আমল : নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দরূদ পড়া
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পাঠেও রিজিকে প্রশস্ততা আসে। যেমনটি অনুমিত হয় নিম্নোক্ত হাদীস থেকে। তোফায়েল ইবন উবাই ইবন কা‘ব রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন,

قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنِّى أُكْثِرُ الصَّلاَةَ عَلَيْكَ فَكَمْ أَجْعَلُ لَكَ مِنْ صَلاَتِى فَقَالَ ্র مَا شِئْتَ গ্ধ. قَالَ قُلْتُ الرُّبُعَ. قَالَ ্র مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ গ্ধ. قُلْتُ النِّصْفَ. قَالَ ্র مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ গ্ধ. قَالَ قُلْتُ فَالثُّلُثَيْنِ. قَالَ ্র مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ গ্ধ. قُلْتُ أَجْعَلُ لَكَ صَلاَتِى كُلَّهَا. قَالَ ্র إِذًا تُكْفَى هَمَّكَ وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ গ্ধ. قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ.
আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনার প্রতি অধিকহারে দরূদ পড়তে চাই, অতএব আমার দু‘আর মধ্যে আপনার দরূদের জন্য কতটুকু অংশ রাখব? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। কা‘ব বলেন, আমি বললাম, এক চতুর্থাংশ। তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। তবে যদি তুমি বেশি পড় তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, অর্ধেক? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও।

তবে তুমি যদি বেশি পড় তা তোমার জন্য উত্তম হবে। কা‘ব বলেন, আমি বললাম, তাহলে দুই তৃতীয়াংশ? তিনি বললেন, তুমি যতটুকু চাও। তবে তুমি যদি বেশি পড় তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, আমার দু‘আর পুরোটা জুড়েই শুধু আপনার দরূদ রাখব। তিনি বললেন, তাহলে তা তোমার ঝামেলা ও প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে। [তিরমিযী : ২৬৪৫; হাকেম, মুস্তাদরাক : ৭৬৭৭ (আবূ ঈসা বলেন, হাদীসটি ‘হাসান’ সহীহ।)]

পঞ্চম আমল : আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা
আল্লাহর রাস্তায় কেউ ব্যয় বা দান করলে তা বিফলে যায় না। সে সম্পদ ফুরায়ও না। বরং তা বাড়ে বৈ কি। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
﴿ قُلۡ إِنَّ رَبِّي يَبۡسُطُ ٱلرِّزۡقَ لِمَن يَشَآءُ مِنۡ عِبَادِهِۦ وَيَقۡدِرُ لَهُۥۚ وَمَآ أَنفَقۡتُم مِّن شَيۡءٖ فَهُوَ يُخۡلِفُهُۥۖ وَهُوَ خَيۡرُ ٱلرَّٰزِقِينَ ٣٩ ﴾ [سبا: ٣٩] ‘বল, ‘নিশ্চয় আমার রব তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা রিযক প্রশস্ত করেন এবং সঙ্কুচিত করেন। আর তোমরা যা কিছু আল্লাহর জন্য ব্যয় কর তিনি তার বিনিময় দেবেন এবং তিনিই উত্তম রিযকদাতা।’ {সূরা আস-সাবা’, আয়াত : ৩৯}

ষষ্ঠ আমল : বারবার হজ-উমরা করা
হজ ও উমরা পাপ মোচনের পাশাপাশি হজকারী ও উমরাকারীর অভাব-অনটন দূর করে এবং তার সম্পদ বাড়িয়ে দেয়। আবদুল্লাহ ইব্ন মাসঊদ রাদিআল্লাহু আনহুমা কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
্র تَابِعُوا بَيْنَ الْحَجِّ وَالْعُمْرَةِ فَإِنَّهُمَا يَنْفِيَانِ الْفَقْرَ وَالذُّنُوبَ كَمَا يَنْفِى الْكِيرُ خَبَثَ الْحَدِيدِ وَالذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ وَلَيْسَ لِلْحَجَّةِ الْمَبْرُورَةِ ثَوَابٌ إِلاَّ الْجَنَّةُ গ্ধ.
‘তোমরা হজ ও উমরা পরপর করতে থাক, কেননা তা অভাব ও গুনাহ দূর করে দেয়, যেমন দূর করে দেয় কামারের হাপর লোহা, সোনা ও রুপার ময়লাকে।’ [তিরমিযী : ৮১৫; নাসাঈ : ২৬৩১]

সপ্তম আমল : দুর্বলের প্রতি সদয় হওয়া বা সদাচার করা
মুস‘আব ইবন সা‘দ রাদিআল্লাহু আনহু যুদ্ধজয়ের পর মনে মনে কল্পনা করলেন, তিনি বোধ হয় তাঁর বীরত্ব ও শৌর্য-বীর্য হেতু অন্যদের চেয়ে নিজেকে বেশি মর্যাদাবান। সেই প্রেক্ষিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
্র هَلْ تُنْصَرُونَ وَتُرْزَقُونَ إِلاَّ بِضُعَفَائِكُمْ
‘তোমাদের মধ্যে থাকা দুর্বলদের কারণে কেবল তোমাদের সাহায্য করা হয় এবং রিজিক প্রদান করা হয়।’ [বুখারী : ২৮৯৬]

অষ্টম আমল : ইবাদতের জন্য ঝঞ্ঝাটমুক্ত হওয়া
আল্লাহর ইবাদতের জন্য ঝামেলামুক্ত হলে এর মাধ্যমেও অভাব দূর হয় এবং প্রাচুর্য লাভ হয়। যেমনটি বর্ণিত হয়েছে আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
্র إِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يَقُولُ يَا ابْنَ آدَمَ تَفَرَّغْ لِعِبَادَتِى أَمْلأْ صَدْرَكَ غِنًى وَأَسُدَّ فَقْرَكَ وَإِلاَّ تَفْعَلْ مَلأْتُ يَدَيْكَ شُغْلاً وَلَمْ أَسُدَّ فَقْرَكَ গ্ধ.
‘আল্লাহ তা‘আলা বলেন, হে আদম সন্তান, আমার ইবাদতের জন্য তুমি ঝামেলামুক্ত হও, আমি তোমার অন্তরকে প্রাচুর্য দিয়ে ভরে দেব এবং তোমার দারিদ্র ঘুচিয়ে দেব। আর যদি তা না কর, তবে তোমার হাত ব্যস্ততায় ভরে দেব এবং তোমার অভাব দূর করব না।’ [তিরমিযী : ২৬৫৪; মুসনাদ আহমদ : ৮৬৮১; ইবন মাজা : ৪১০৭]

নবম আমল : আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করা
আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে হিজরত তথা স্বদেশ ত্যাগ করলে এর মাধ্যমেও রিজিকে প্রশস্ততা ঘটে। যেমনটি অনুধাবিত হয় নিচের আয়াত থেকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ ۞وَمَن يُهَاجِرۡ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ يَجِدۡ فِي ٱلۡأَرۡضِ مُرَٰغَمٗا كَثِيرٗا وَسَعَةٗۚ وَمَن يَخۡرُجۡ مِنۢ بَيۡتِهِۦ مُهَاجِرًا إِلَى ٱللَّهِ وَرَسُولِهِۦ ثُمَّ يُدۡرِكۡهُ ٱلۡمَوۡتُ فَقَدۡ وَقَعَ أَجۡرُهُۥ عَلَى ٱللَّهِۗ وَكَانَ ٱللَّهُ غَفُورٗا رَّحِيمٗا ١٠٠ ﴾ [النساء : ١٠٠] ‘আর যে আল্লাহর রাস্তায় হিজরত করবে, সে যমীনে বহু আশ্রয়ের জায়গা ও সচ্ছলতা পাবে। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উদ্দেশ্যে মুহাজির হয়ে নিজ ঘর থেকে বের হয় তারপর তাকে মৃত্যু পেয়ে বসে, তাহলে তার প্রতিদান আল্লাহর উপর অবধারিত হয়। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ {সূরা আন-নিসা, আয়াত : ১০০}
আয়াতের ব্যাখ্যা আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস প্রমুখ সাহাবী রাদিআল্লাহু আনহুদ বলেন, স্বচ্ছলতা অর্থ রিজিকে প্রশস্ততা।

দশম আমল : আল্লাহর পথে জিহাদ
একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের জিহাদেও সম্পদের ব্যপ্তি ঘটে। গনীমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদের মাধ্যমে সংসারে প্রাচুর্য আসে। যেমন ইবন উমর রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
্র وَجُعِلَ رِزْقِي تَحْتَ ظِلِّ رُمْحِي গ্ধ.
‘আর আমার রিজিক রাখা হয়েছে আমার বর্শার ছায়াতলে।’ [মুসনাদ আহমদ : ৫৬৬৭; বাইহাকী : ১১৫৪; শু‘আবুল ঈমান : ১৯৭৮৩]

একাদশ আমল : আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা
সাধারণভাবে আল্লাহ যে রিজিক ও নিয়ামতরাজি দান করেছেন তার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া করা এবং তাঁর স্তুতি গাওয়া। কারণ, শুকরিয়ার ফলে নেয়ামত বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
﴿ وَإِذۡ تَأَذَّنَ رَبُّكُمۡ لَئِن شَكَرۡتُمۡ لَأَزِيدَنَّكُمۡۖ وَلَئِن كَفَرۡتُمۡ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٞ ٧ ﴾ [ابراهيم: ٧] ‘আর যখন তোমাদের রব ঘোষণা দিলেন, ‘যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের বাড়িয়ে দেব, আর যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও, নিশ্চয় আমার আযাব বড় কঠিন।’ {সূরা ইবরাহীম, আয়াত : ০৭}
আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা শুকরিয়ার বদৌলতে নেয়ামত বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। আর বলাবাহুল্য আল্লাহর বাড়ানোর কোনো সীমা-পরিসীমা নাই।

দ্বাদশ আমল : বিয়ে করা
আজকাল মানুষের দুনিয়ার প্রাচুর্য ও বিলাসের প্রতি আসক্তি এত বেশি বেড়েছে, তারা প্রচুর অর্থ নেই এ যুক্তিতে প্রয়োজন সত্ত্বেও বিয়ে বিলম্বিত করার পক্ষে রায় দেন। তাদের কাছে আশ্চর্য লাগতে পারে এ কথা যে বিয়ের মাধ্যমেও মানুষের সংসারে প্রাচুর্য আসে। কারণ, সংসারে নতুন যে কেউ যুক্ত হয়, সে তো তার জন্য বরাদ্দ রিজিক নিয়েই আসে।
আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
﴿ وَأَنكِحُواْ ٱلۡأَيَٰمَىٰ مِنكُمۡ وَٱلصَّٰلِحِينَ مِنۡ عِبَادِكُمۡ وَإِمَآئِكُمۡۚ إِن يَكُونُواْ فُقَرَآءَ يُغۡنِهِمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٞ ٣٢ ﴾ [النور : ٣٢] ‘আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী।’ {সূরা আন-নূর, আয়াত : ৩২}
উমর ইবন খাত্তাব রাদিআল্লাহু আনহুমা বলতেন, ওই ব্যক্তির ব্যাপার বিস্ময়কর যে বিয়ের মধ্যে প্রাচুর্য খোঁজে না। কারণ স্বয়ং আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন।’

ত্রয়োদশ আমল : অভাবের সময় আল্লাহমুখী হওয়া এবং তার কাছে দু‘আ করা
রিজিক অর্জনে এবং অভাব দূরীকরণে প্রয়োজন আল্লাহর কাছে দু‘আ করা। কারণ, তিনি প্রার্থনা কবুল করেন। আর আল্লাহ তা‘আলাই রিজিকদাতা এবং তিনি অসীম ক্ষমতাবান।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡۚ ﴾ [غافر: ٦٠] ‘আর তোমাদের রব বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দেব।’ {সূরা আল-মু‘মিন, আয়াত : ৬০}
এ আয়াতে আল্লাহ দু‘আ করার নির্দেশ দিয়েছেন আর তিনি তা কবুলের জিম্মাদারি নিয়েছেন। যাবৎ না তা কবুলে পথে কোনো অন্তরায় না হয়। যেমন ওয়াজিব তরক করা, হারাম কাজে জড়ানো, হারাম আহার গ্রহণ বা হারাপ পরিচ্ছদ পরা ইত্যাদি এবং কবুলকে খানিক বিলম্বিতকরণ। আল্লাহর কাছে দু‘আয় বলা যেতে পারে,
‘হে রিজিকদাতা আমাকে রিজিক দান করুন, আপনি সর্বোত্তম রিজিকদাতা। হে আল্লাহ আমি আপনার কাছে পবিত্র সুপ্রশস্ত রিজিক চাই। হে ওই সত্তা, দানের ঢল সত্ত্বেও যার ভা-ারে কমতি হয় না। হে আল্লাহ, আমাকে আপনি আপনার হালাল দিয়ে আপনার হারাম থেকে যথেষ্ট করে দিন আর আপনার দয়া দিয়ে আপনি ছাড়া অন্যদের থেকে যথেষ্ট হয়ে যান। হে আল্লাহ আপনি আমাকে যে রিজিক দিয়েছেন তা দিয়েই সন্তুষ্ট বানিয়ে দিন। আর যা আমাকে দিয়েছেন তাতে বরকত দিন।’
অভাবকালে মানুষের কাছে হাত না পেতে আল্লাহর শরণাপন্ন হলে এবং তাঁর কাছেই প্রাচুর্য চাইলে অবশ্যই তার অভাব মোচন হবে এবং রিজিক বাড়ানো হবে।
আবদুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
্র مَنْ نَزَلَتْ بِهِ فَاقَةٌ فَأَنْزَلَهَا بِالنَّاسِ لَمْ تُسَدَّ فَاقَتُهُ وَمَنْ نَزَلَتْ بِهِ فَاقَةٌ فَأَنْزَلَهَا بِاللَّهِ فَيُوشِكُ اللَّهُ لَهُ بِرِزْقٍ عَاجِلٍ أَوْ آجِلٍ গ্ধ.
‘যে ব্যক্তি অভাবে পতিত হয়, অতপর তা সে মানুষের কাছে সোপর্দ করে (অভাব দূরিকরণে মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়), তার অভাব মোচন করা হয় না। পক্ষান্তরে যে অভাবে পতিত হয়ে এর প্রতিকারে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল হয় তবে অনিতবিলম্বে আল্লাহ তাকে তরিৎ বা ধীর রিজিক দেবেন। [তিরমিযী : ২৮৯৬; মুসনাদ আহমদ : ৪২১৮]

চতুর্দশ আমল : গুনাহ ত্যাগ করা, আল্লাহর দীনের ওপর সদা অটল থাকা এবং নেকীর কাজ করে যাওয়া।
গুনাহ ত্যাগ করা, আল্লাহর দীনের ওপর অটল থাকা এবং নেকীর কাজ করা- এসবের মাধ্যমেও রিজিকের রাস্তা প্রশস্ত হয় যেমন পূর্বোক্ত আয়াতগুলো থেকে অনুমান করা যায়।
তবে সর্বোপরি আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা দুনিয়াতে চিরদিন থাকার জন্য আসি নি। তাই দুনিয়াকে প্রাধান্য না দিয়ে উচিত হবে আখিরাতকে অগ্রাধিকার ও প্রাধান্য দেয়া।
আমাদের এদেন অবস্থা দেখে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ بَلۡ تُؤۡثِرُونَ ٱلۡحَيَوٰةَ ٱلدُّنۡيَا ١٦ وَٱلۡأٓخِرَةُ خَيۡرٞ وَأَبۡقَىٰٓ ١٧ ﴾ [الاعلى: ١٦، ١٧] ‘বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিচ্ছ। অথচ আখিরাত সর্বোত্তম ও স্থায়ী।’ {সূরা আল-আ‘লা, আয়াত : ১৬-১৭}
আর পরকালের মুক্তি ও চিরশান্তিই যার প্রধান লক্ষ্য তার উচিত হবে রিজিকের জন্য হাহাকার না করে অল্পে তুষ্ট হতে চেষ্টা করা।
যেমন : হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন আ‘স রাদিআল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
্র قَدْ أَفْلَحَ مَنْ أَسْلَمَ وَرُزِقَ كَفَافًا وَقَنَّعَهُ اللَّهُ بِمَا آتَاهُ গ্ধ.
‘ওই ব্যক্তি প্রকৃত সফল যে ইসলাম গ্রহণ করেছে আর তাকে জীবন ধারণে (অভাবও নয়; বিলাসও নয়) পর্যাপ্ত পরিমাণ রিজিক দেয়া হয়েছে এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তাতে তুষ্টও করেছেন। [মুসলিম : ২৪৭৩; তিরমিযী : ২৩৪৮; আহমদ : ৬৫৭২] পরিশেষে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদের এসব উপায়-উপকরণ যোগাড় করে রিজিক তথা হালাল উপার্জনে উদ্যোগী ও সফল হবার তাওফীক দান করেন। তিনি যেন আপনাদের রিজিক ও উপার্জনে প্রশস্ততা দান করেন।

জুমার দিনের মর্যাদা-ফজিলত ও গুরুত্ব – জেনে নিন কাজে আসবে।

আব্দুল্লাহ্ ইব্নে ইউসুফ (রা.) ও আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমার দিন জানাবত (ফরজ) গোসলের মত গোসল করে সালাতের জন্য আগমণ করে, সে যেন একটি উট কুরবানী করল। যে ব্যক্তি দ্বিতীয় পর্যায়ে আগমণ করে, সে যেন একটি গাভী কুরবানী করল। যে ব্যক্তি তৃতীয় পর্যায়ে যে আগমণ করে, সে যেন একটি শিং বিশিষ্ট দুম্বা কুরবানী করল। চতুর্থ পর্যায়ে যে আগমণ করে সে যেন একটি মুরগী কুরবানী করল। পঞ্চম পর্যায়ে যে আগমণ করল সে যেন একটি ডিম কুরবানী করল। পরে ইমাম যখন খুতবা প্রদানের জন্য বের হয় তখন ফেরেশতাগণ জিকির শোনার জন্য হাজির হয়ে থাকেন।

আবু নুআইম (রাহ.) ও আবু হুরায়ারা (রা.) থেকে বর্ণিত, জুমার দিন হজরত ওমর ইব্নে খাত্তাব (রা.) খুতবা দিচ্ছিলেন, এমন সময় এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করেন। হজরত ওমর (রা.) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, সালাতে সময় মত আসতে তোমরা কেন বাধাগ্রস্ত হও? তিনি বললেন, আজান শোনার সাথে সাথেই তো আমি অজু করছি। তখন হজরত ওমর (রা.) বললেন, তোমরা কি নবি করিম (সা.) কে এ কথা বলতে শোননি যে, যখন তোমাদের কেউ জুমার সালাতে রওয়ানা হয়, তখন সে যেন গোসল করে নেয়।

জুমার দিনের বৈশিষ্ট্য : ইসলামি শরিয়তের বিধানে জুমার দিনের মাহাত্ম্য সীমাহীন। এই দিন মানব জাতির আদি পিতা- হজরত আদম (আ.) এর দেহের বিভিন্ন অংশ সংযোজিত বা জমা করা হয়েছিল বলেই দিনটির নাম জুমা রাখা হয়েছে। জুমার দিনকে আল্লাহ্পাক সীমাহীন বরকত দ্বারা সমৃদ্ধ করেছেন। এটি সপ্তাহের সেরা দিন। হাদিস শরিফের বর্ণনা অনুযায়ী এই বরকতময় দিনটি আল্লাহ্পাক বিশেষভাবে উম্মতে মুহাম্মদিকে (সা.) দান করেছেন।

নবি করিম (সা.) ইরশাদ করেন, সর্বাপেক্ষা উত্তম ও বরকতময় দিন হচ্ছে জুমার দিন। এই পবিত্র দিনে হজরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং এই দিনে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়। (মুসলিম শরিফ)

জুমার সমগ্র দিনটিই অপেক্ষার : হাদিস শরিফের বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহ্পাক জুমা দিবসের মধ্যে এমন একটি মুহূর্ত লুকিয়ে রেখেছেন, যে সময়টাতে দোয়া অবশ্যই কবুল হয়। আল্লাহ্র রাসূল (সা.) বলেন, জুমার সমগ্র দিবসটির মধ্যে এমন একটি মুহূর্ত লুকিয়ে আছে যে সময়টাতে কোন বান্দা যদি নামাজরত থাকে বা- তাসবিহ্-তাহলিল কিংবা দোয়ায় মশগুল থাকে তবে আল্লাহ্পাক তাঁর আকুতি অবশ্যই কবুল করে থাকেন। এই হাদিসের মর্ম অনুযায়ী বুঝা যায় যে, জুমার দিন সবটুকুই অপেক্ষার। আল্লাহ নিকট দোয়া কবুল করানোর জন্য দিনভরই প্রস্ত্ততি থাকতে হবে।

বিশেষ সেই মূল্যবান মুহূর্তটি কখন- এ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ আলেমগণের বিভিন্ন মন্তব্য রয়েছে। কেউ বলেছেন, ফজরের সময় থেকে সূর্যোদয় সর্যন্ত এই মুহূর্তটি রয়েছে। কারো মতে জুমার সময় শুরু থেকে খুতবা ও জুমার নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত এই সময়টি হতে পারে। কারো মতে জুমার দিন আসরের সময় থেকে সূর্যাস্তের সময় পর্যন্ত এই সময় হতে পারে। এই ধরনের আরও কিছু বক্তব্য পাওয়া যায়।

হাদিস শরিফে জুমার দিনকে সাপ্তাহিক ঈদের দিন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, জুমা তোমাদের পারস্পরিক দেখা সাক্ষাত ও সাপ্তাহিক ঈদের দিন। তাই এই দিনটি রোজার জন্য নির্ধারিত করা সমীচীন নয়। জুমার আগের রাত্রিটিও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, জুমার পূর্ববর্তী রাতে বনি আদমের সমস্ত আমল মহান আল্লাহ্র দরবারে পেশ করা হয়। (বুখারি, আহমদ)

জুমার দিনের ফজর নামজ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, যারা এই নামাজের জামাতে শরীক হন আল্লাহ্পাক তাদের সকল গোনাহ্ মাফ করেন এবং অফুরন্ত নিয়ামতের ভাগী করেন। একমাত্র সম্পর্ক ছিন্নকারীদের ছাড়া। অর্থাৎ ঐ হতভাগ্যদের কোন আকুতি জুমার দিনের ফজরের শুভক্ষণেও আল্লাহ্র নিকট কবুল হয় না।(বুখারি)

হাদিস শরিফে আরও বর্ণিত হয়েছে যে, জুমার দিন ফজরের নামাজ জামাতের সাথে আদায়কারীর মত সৌভাগ্যবান আর কেউ হতে পারে না। কারণ, বান্দা যখন এই নামাজের পর হাত তোলে মুনাজাত করে তখন মহান আল্লাহ্পাক কোন অবস্থাতেই তা ফিরিয়ে দেন না। (বাইহাকি শরিফ)

জুমার দিনে কোরান তেলাওয়াত : জুমার দিন ফজর থেকে মাগরীবের মধ্যবর্তী সময়ে পবিত্র কোরানের সূরা ইয়াছিন, সূরা হুদ, সূরা কাহাফ এবং সূরা দোখান তেলাওয়াত কর, এই সূরাগুলিতে বর্ণিত বিষয়বস্ত্ত- অনুধাবন ও চিন্তাভাবনা করার বিশেষ ফজিলতের কথা হাদিস শরিফের বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। বাইহাকি শরিফে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, জুমার দিন সূরা হুদ পাঠ করো। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, যে ব্যক্তি জুমার দিনে সূরা কাহাফ তেলাওয়াত করবে, তার জন্য এক জুমা থেকে অন্য জুমা পর্যন্ত বিশেষ নূরের বাতি জ্বালানো হবে। তিবরানি শরিফের এক বর্ণনায় রয়েছে যে, যে ব্যক্তি জুমার দিনে বা রাতে সূরা দোখান তেলাওয়াত করে, আল্লাহ্পাক তার জন্য জান্নাতে একটা বিশেষ মহল নির্মাণ করেন।

জুমার দিনে ও রাতে দরূদ শরিফ পাঠের ফজিলত : জুমার দিনে ও রাতে বেশি করে দরূদ শরিফ পাঠ করার বিশেষ ফজিলতের কথা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইরশাদ করেছেন, জুমার দিনে ও রাতে আমার প্রতি বেশি করে দরূদ শরিফ পাঠ করো। যে ব্যক্তি এরূপ দরূদ শরিফ পাঠ করবে, হাশরের ময়দানে আমি তার জন্য আল্লাহ সামনে সাক্ষ্য প্রদান করব এবং সুপারিশ করব। (বাইহাকি শরিফ)
নবি করিম (সা.) -এর সুসংবাদের ভিত্তিতেই সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আবেদ-জাহেদ বান্দাগণ জুমা দিবসে সর্বাধিক দরূদ শরিফ পড়ে আসছেন। অত্যধিক দরূদ পঠিত হয় বলেই জুমার দিনকে ইয়াওমুজ্জাহারা অর্থাৎ ফুলেল দিবস এবং জুমার রাতকে লাইলাতুজ জাহরা বা ফুলেল রজনী নামে অভিহিত করা হয়। দুনিয়ার জীবনে হেদায়তের পথ প্রদর্শক এবং আখেরাতের চিরস্থায়ী শান্তি ও মুক্তির ঠিকানা জান্নাতের জিম্মাদার হজরত নবি করিম (সা.) -এর প্রতি দরূদ শরিফ ও সালাম পেশ করতে থাকা প্রত্যেক মুমিন নর-নারীদের জন্য পরম সৌভাগ্যের বিষয়। বিশেষ সময় ও দিনক্ষণের প্রতি লক্ষ্য রেখে দরূদ শরিফ বেশি করে পড়ার চেষ্টা করা সবারই একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য।

জুমার নামাজে হাজিরা ও খুতবা শ্রবণ : মুমিনের সাপ্তাহিক ঈদ সমাবেশ জুমার নামাজে আগেভাগে হাজির হওয়া এবং মনোযোগসহকারে জুমার বয়ান ও খুতবা শ্রবণ করার বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলতের কথা বলা হয়েছে। হাদিসের বর্ণনায় আছে যে, জুমার জামাতের সময় মসজিদের দ্বারদেশে রহমতের ফেরেশতাগণ অবস্থান গ্রহণ করে কে কখন হাজির হচ্ছে তা লক্ষ্য করেন। যারা নিতান্ত বিনয়, নম্রতা ও বিশেষ মনোযোগর সাথে জুমার হাজিরা দেন তাদের নাম রহমতপ্রাপ্ত বান্দাদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করে রাখেন। আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ থেকে শান্তির একটি আবাহ সৃষ্টি হয়। তাতে ইবাদতে মনোনিবেশ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। হজরত নবি করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, জুমার দিন শয়তান বাজারগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং লোকজনকে কাজে কর্মে ব্যস্ত করে তোলে। আর ফেরেশতাগণ মসজিদের দরজায় উপস্থিত হয়ে হাজিরা লিপিবব্ধ করতে থাকেন মুসল্লিগণের পর্যায়ক্রমে উপস্থিতি। যারা খুতবা শুরু হওয়ার পরে এসে তাড়াহুড়া করে সামনে আসতে চেষ্টা করে, হাদিস শরিফে তাদের প্রতি কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। ইমাম তিরমিযি কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি জুমার জামাতে পরে এসে লোকজনের কাঁধ ডিঙ্গিয়ে সামনের দিকে স্থান নিতে চেষ্টা করে সে যেন নিজের জন্য জাহান্নামে যাওয়ার একটি সেতু নির্মাণ করলো।

ইমাম আহমদ (র.) বর্ণনা করেন যে, একদা রাসূল (সা.) জুমার খুতবা দিচ্ছিলেন, এ সময় এক ব্যক্তিকে উপবিষ্ট লোকদের কাঁধ ডিঙ্গিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে দেখে অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে বললেন, ওহে! বসে পড় দেরিতে এসেছ এবং অন্যদের কষ্ট দিচ্ছ।

খুতবা শ্রবণের গুরুত্ব : পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, যখন জুমার দিন নামাজের জন্য আহবান জানানো হয় (অর্থাৎ আজান দেওয়া হয়) তখন দ্রুততার সাথে আল্লাহ্র জিকির (অর্থাৎ জুমার খুত্বা) শ্রবণের প্রতি ধাবিত হও। আর ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ কর। (সূরা জুমাআ) জুমার দিনে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অর্জনের লক্ষ্যে গোসল করা এবং সাধ্যমত উত্তম পোষাক পরিধান করারও হুকুম দেওয়া হয়েছে। জীবন জীবিকার ধান্দায় যাতে জুমার প্রস্ত্ততি ও খুত্বা শ্রবণে বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়, সে দিকটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়েছে যে, জুমার গুরুত্বের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রতি ঝুকে পড়ো না। উত্তম রিযিকদাতা হচ্ছেন মহান আল্লাহ্।

উপরে আলোচিত পবিত্র কোরানের আয়াত এবং ও হাদিস প্রমাণ করে যে, জুমার দিন এবং এ পবিত্র দিনের ইবাদত বন্দেগীর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান ও জীবন জীবিকার দোহাই দিয়ে এই দিনের গুরুত্ব বিনষ্ট করা কোন ঈমানদার ব্যক্তির কাজ হতে পারে না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে পবিত্র জুমার দিনের গুরুত্ব ও মর্যাদা অনুধাবন করার এবং আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

এই যুবকটির মুখে এত সুন্দর কোরআন তেলাওয়াত শুনে সারা বিশ্ব অবাক! (ভিডিও সহ)

এই যুবকটির মুখে এত সুন্দর কোরআন তেলাওয়াত শুনে সারা বিশ্ব অবাক! এই যুবকটির মুখে এত সুন্দর কোরআন তেলাওয়াত শুনে সারা বিশ্ব অবাক!

এই যুবকটির মুখে এত সুন্দর কোরআন তেলাওয়াত শুনে সারা বিশ্ব অবাক! এই যুবকটির মুখে এত সুন্দর কোরআন তেলাওয়াত শুনে সারা বিশ্ব অবাক!

ইসলামের নির্দেশ অনুযায়ী স্বামীকে পূরণ করতে হবে স্ত্রীর মৌলিক ১০ টি হক!তানাহলে হয় স্ত্রীরা পরকীয়ায় অাসক্ত হবে!দেখুন,,,

বাসর রাত মুমিন জীবনের অন্যতম রাত। যারা পরকীয়া করে, লিভ টুগেদার করে, তারা এ রাতের মর্ম বুঝবে না। যারা বেশ্যা বা বহুগামিতা তাদের কাছে এ রাত বাতুলতা মাত্র। আমরা এ পর্বে বাসর রাতে অবশ্য পালনীয় কিছু টিপ্স নিয়ে আলোচনা করব।

 

০১. গোলাপ ফুল দিয়ে দুজন দুজনাকে বরণ করে নিতে হবে।
০২. উভয়ই মহান আল্লাহকে যে ভালবাসবেন তা পরিষ্কার ভাবে দুজনা বোঝা পড়া করবেন।
০৩. হানিমুনে কোথায় যাবেন তা বাসর রাতেই ঠিক করবেন, সে ক্ষেত্রে স্বামী স্ত্রীকে এটা ঠিক করতে হবে যে, সবচেয়ে পৃথিবীর মূল্যবান যায়গা মক্কা মদীনায় যাওয়া এবং ওমরা করার পরিকল্পনা করা।
০৪. ছোট খাট ভুলের জন্য কাউকে তিরষ্কার না করা। কাউকে ছোট না করা।
০৫. কোন পক্ষের আত্নীয় স্বজনকে ছোট না করা, গালি না দেওয়া, অপমান না করা।
০৬. জীবনের প্রথম ভালবাসার রাত, তাই ভালবাসা অক্ষুন্ন রাখা।
০৭. দুজনাতে একটু খোশ গল্প করা, জীবন থেকে কোন গল্প বলা।
০৮. ভবিষ্যত জেনারেশনের ব্যাপারে আলাপ সেরে নেওয়া। তবে বেশী দূর অগ্রসর না হওয়াই ভাল।
০৯. মোহরানা যদি বাকি থাকে সেটা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া, অল্প দিনের মধ্যেই মোহরানা পরিশোধ করা। স্ত্রী যদি চাকুরি করে তবে টাইম টেবিলটা নিয়ে একটু পরিষ্কার
১০. এ রাতই হল উত্তম ভালবাসার রাত। দুজনার সব আকুতি মেশানো ভালবাসা দিয়ে দুজনাকে জয় করা। কোন ভাবেই যেন ফজরের নামাজ কাজা না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা ।

 

ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিয়েই হচ্ছে একমাত্র বৈধ উপায়। বিয়েতে মোহরানা ধার্য করা এবং তা যথারীতি আদায় করার জন্য ইসলামে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়েছে। স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে মোহরানা প্রদান করা ফরজ।

কোরআন ও হাদীসের আলোকে মোহরানা :

মোহরানা সম্পর্কে কোরআনের বানী :

আল্লাহ তায়ালা বলেন,
‘তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের নিকট যে যৌন স্বাধ গ্রহন কর, তার বিনিময়ে তাদের মোহরানা ফরজ মনে করে আদায় কর।’ (সূরা নিসা-২৪)

 

আল্লাহ তায়ালা বলেন,
‘অতঃপর নারীদের অভিভাবকের অনুমুতি নিয়ে তাদের বিয়ে কর এবং তাদের মোহর যথাযথভাবে আদায় করে দাও।’ (সূরা নিসা-২৫)

 

আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“স্ত্রীদের প্রাপ্য মোহরানা আদায় করে দাও, খূশী হয়ে ও তাদের প্রাপ্য অধিকার মনে করে।’ (সূরা নিসা-৪)

 

অত্র আয়াত সমুহ প্রমাণ করে যে, মোহরানা ফরজ বা আদায় করা অপরিহার্য।

 

মোহরানা সম্পর্কে রাসুল (সাঃ) এর বানী :

উক্ববা ইবনু আমের (রাঃ) বলেন, রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “অবশ্যই পূরণীয় শর্ত হচ্ছে, যার বিনিময়ে তোমরা স্ত্রীর যৌনাঙ্গ নিজেদের জন্য হালাল মনে কর।’ (বুখারী,মুসলিম)

 

মহানবী (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোন মেয়েকে মোহরানা দেয়ার ওয়াদায় বিয়ে করেছে, কিন্তু সে মোহরানা আদায় করার তার ইচ্ছে নেই, সে কেয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে অপরাধী হিসেবে দাঁড়াতে বাধ্য হবে।’ (মুসনাদে আহমেদ)।

 

সুতরাং মোহরানা স্ত্রীর এমন একটি প্রাপ্য যা তিনি স্বামীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগে পাওনা হন, তবে স্ত্রী (স্বেচ্ছায় ও স্বত:স্ফূর্তভাবে) সময় দিলে বাকি রাখা যাবে। কিন্তু মোহরানার অর্থ আবশ্যিকভাবে পরিশোধ করতে হবে। বিবাহিত স্ত্রীকে অসহায় মনে করে ছলে-বলে-কৌশলে বা অজ্ঞতার সুযোগে মাফ করিয়ে নিলে মাফ না হয়ে তা হবে জুলুম-প্রতারণা। এ জুলুম প্রতিরোধকল্পে মহান আল্লাহপাক ঘোষণা করেন – ‘যদি স্ত্রী নিজের পক্ষ থেকে স্বত:প্রবৃত্ত হয়ে মোহরের কিছু অংশ ক্ষমা করে দেয়, তবে তোমরা তা হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করতে পার।’ (সূরা নিসা, আয়াত-৪)।

 

মোহরানা এককালীন আদায় করতে অক্ষম হলে, উত্তম হল কিছু অংশ নগদ আদায় করে বাকি অংশ পরে আদায় করা, তা ধীরে ধীরে কিস্তিতে পরিশোধ করা। তবে মোহরানা নির্ধারণ করতে হবে স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী যাতে তিনি সহজেই তা পরিশোধ করতে পারেন। কিন্তু বর্তমান সমাজের দু:খজনক ঘটনা হলো-বিশাল আকারের মোহরানা বাধা হয় নামে মাত্র অথচ বহুলাংশে তা পরিশোধ করতে দেখা যায় না।

 

আমাদের সমাজে কি দেখতে পাচ্ছি ?

আজ থেকে ২০/২৫ বছর আগেও বিয়েতে অল্প পরিমান মোহরানা ধার্য করা হতো। স্ত্রীকে প্রদান করতো কিনা আমার জানা নেই। তবে বর্তমানে বিয়েতে বেশী পরিমানে মোহরানা ধার্য করা হচ্ছে তার অন্যতম কারন হচ্ছে –

বিবাহ বিচ্ছেদ দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাই মোহরানা বেশী ধার্য করা হয় যাতে স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিতে ভয় পায়।

 

*** বর্তমানে ধনী পরিবারের বিয়েতে লোক দেখানোর জন্য কোটি টাকা মোহরানা ধার্য করা হয়।
*** মধ্যেবিত্ত পরিবারের বিয়েতেও ১০ লক্ষ টাকার উপরে মোহরানা ধার্য করা হয়।
*** নিম্মবিত্ত পরিবারের বিয়েতে ২ লাখ টাকার উপরে মোহরানা ধার্য করা হয়।
*** বিয়েতে স্ত্রীকে দেয়া স্বর্ন ক্রয়ের টাকাটা অর্ধেক অথবা পুরাটাই মোহরানা থেকে কর্তন করা হয়। আর বাকীটা পরে প্রদান করার প্রতিশ্রতি দিয়ে থাকে।

 

মিথ্যা ওয়াদা দিয়েই নব-দম্পর্তির সংসার জীবন শুরু হয় :

স্ত্রীকে মোহরানা আদায় করা ফরজ। আর এই ফরজ কাজটি না করে কিভাবে সংসার জীবন শুরু করবে? তাই বিয়ের পর স্ত্রীর সাথে প্রথম সাক্ষাতেই এই বিষয়টি ফয়সালা করা হয়। বউকে পরবর্তীতে প্রদান করার ঘোষনা দিয়েই সংসার জীবন শুরু করতে হয়। অচত আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের নিকট যে যৌন স্বাধ গ্রহন কর, তার বিনিময়ে তাদের মোহরানা ফরজ মনে করে আদায় কর।’ তারপর মোহরানা আদায় না করে বছরের পর বছর স্ত্রীর সাথে বসবাস করে। স্ত্রীও সংসারের সুখ-শান্তি নষ্ট হবার ভয়ে স্বামীর কাছে মোহরানা অর্থ চাইতে সংকোচ করে। অনেকে স্বামী মোহরানার অর্থ আদায় না করেই কোন এক সময় না ফেরার দেশে চলে যায়। অনেকে সংসারে অশান্তি দেখা দিলে তালাকের মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনের ইতি ঘঁটান আর তখনই স্বামীকে আদালতের রায়ের মাধ্যমে মোহরানার অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য হয়।

আল্লাহ ও রাসুল (সাঃ) এর নির্দেশকে অমান্য করে আজ আমরা বিয়েতে মোহরানা কে কত বেশী দিতে পারি, কে কত নিতে পারি সেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছি। যার ফলে সংসারে অশান্তি,ভূল-বোঝাবুঝি, পরিশেষে বিচ্ছেদের মত ঘঁটনা ঘটে।

 

তাই সবাইকে বলছি, বিয়েতে সমতা রক্ষা করুন। কম মোহরানা ধার্য করুন। আর মোহরানা আদায় করেই সংসার জীবন শরুন। মনে রাখবেন, পরবর্তীতে প্রদান করার মিথ্যা প্রতিশ্র“তি দিয়ে সংসার শুরু করলেও যে কোন মুহুত্বে আপনার মৃত্যু হতে পারে। তখন আপনার স্ত্রী কার কাছে মোহরানা চাইবে? যদি মোহরানা আদায় করার মত কিছু না থাকে? স্ত্রীর মোহরানা আদায় না করে আপনি কি জান্নাতে যেতে পারবেন?

 

তাই কেবল সামাজিক স্টাটাস রক্ষার জন্য মোটা অংকের মোহরানা নয়; বরং সামর্থ্যরে মধ্যে মোহরানা বেঁধে নির্দিষ্ট সময়ে বাসর হওয়ার আগেই তা পরিশোধ করে দেয়া উচিত।

 

কাহিনীঃ জাফর তানিয়াকে ১৬ লাখ টাকা মোহরানা ধার্য করে বিয়ে করেছে। বিয়েতে জাফর তানিয়াকে দশ ভরি স্বর্ণ উপহার দেয়। দুই পরিবারের সম্মতিতে স্বর্নের মূল্য থেকে তিন লাখ টাকা উসুল দেখিয়ে বাকী টাকা পরে পরিশোধ করার অঙ্গীকার করে বিয়ে হয়েছে। বিয়ের পরে বাসর রাতে জাফরের ভাবী রুমে প্রবেশ করে মোহরানার বাকী টাকাটা কিভাবে পরিশোধ করবে জাফরের কাছে জানতে চায়। জাফর পরবর্তীতে পরিশোধ করবে বলে ভাবীর সামনে তানিয়াকে জানায়। তানিয়া এই প্রস্তাবে রাজী হয়ে জাফরকে নিয়ে স্বপ্নের বাসর রাত পার করে।

 

বাসর রাতে বিড়াল মারা নিয়ে বিবাহিত/অবিবাহিত নারী/পুরুষরা নানা গুঞ্জন করে থাকে। একেক একজন একেক দৃষ্টি ভঙ্গিতে দেখে। সবাই এই বিষয়টিকে নিয়ে হাসি-তামাশা করে। বিড়াল মারতে পারলে সবাই খুশী। তবে দুঃখ জনক হলেও সত্য যে আজকাল স্বামীরা বাসর রাতে বিড়াল মারা তো দুরের কথা উল্টো বউয়ের কাছে মাফ চাইতে হয়। কেন মাফ চাইতে হয় জানেন? তাহলে শুনুন।

 

আজ থেকে কয়েক দশক আগেও বিয়েতে খুব অল্প পরিমান মোহরানা ধার্য করা হত। বেশীর ভাগ স্বামী মোহরানা আদায় করে দিত। কেউবা বউয়ের নামে জমি লিখে দিত। কিন্তু আজকাল মোহরানা নিয়ে বর-কনে দু’পক্ষের মধ্যে দর কষাকষি শুরু হয়।

 

ডিজিটাল এই যুগে তালাকের পরিমান দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাই তালাক ঠেকাতে এখন মোহরানার পরিমান বেশী ধার্য করা হয়। মোহরানার টাকা স্বামী স্ত্রীকে দিতে পারবে কি পারবে না তা আর কেউ দেখে না। এখন বেশী টাকা মোহরানা ধার্য করে বিয়ে ঠিকিয়ে রাখার জন্য সবাই চেষ্টা করে। স্বামীকে চাপের মধ্যে রাখে। এই সুযোগে স্ত্রীদের পক্ষ থেকে তালাকের প্রস্তাব বেশী আসছে। তাই তালাকের পরিমান দিন দিন বেড়েই চলেছে।

 

ইসলামে মোহরানা আদায় করে স্ত্রীর কাছে যেতে বলা হয়েছে। বর্তমানে বিয়েতে স্ত্রীকে উপহার দেয়া স্বর্নের মূল্য হিসাব করে কিছু টাকা উসুল দেখিয়ে মোহরানার বাকী টাকাটা বাকীর খাতায় রেখে দেয়া হয়। তাই মোহরানার টাকা শত ভাগ পরিশোধ না করে বাসর রাতে স্বামী স্ত্রীকে মোহরানার বাকী টাকা পরে পরিশোধ করার ওয়াদা করে থাকে। স্ত্রীও স্বামীর কথায় বিশ্বাস করে সংসার জীবন শুরু করে। তাই বাসর রাতে বিড়াল মারার পরিবর্তে উল্টো স্ত্রীর কাছে মোহরানার টাকা নিয়ে ছোট হতে হয়।

 

দাম্পত্য জীবনে কোন এক সময় ভুল-বুঝাবুঝি হলে তালাকের মাধ্যমে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইলে স্বামী স্ত্রীকে মোহরানার টাকা পরিশোধ করতে হয়। মোহরানার টাকা পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে স্বামী জেলের ভাত খেতে হয়।

 

তাই বাসর রাতে বিড়াল মারা নিয়ে যারা অতি উৎসাহী তাদেরকে বলতে চাই, বাসর রাতে বিড়াল মারার আগে স্ত্রীর মোহরানা আদায় করুন। মোহরানা আদায় না করে যদি আপনার মৃত্যু হয় তাহলে আপনাকে কঠিন শাস্তি পেতে হবে –

 

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বাসর রাতে স্বামী-স্ত্রীর করণীয় কি পড়ে দেখুনঃ

বাসরঘর ও কনে সাজানো এবং তাদের জন্য দোয়া করাঃ

নতুন বর ও কনের জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন, যেখানে সুন্দরভাবে সাজিয়ে সুসজ্জিত করে বরের নিকট পেশ করা হবে। যেসব মহিলারা কনেকে সাজাবে তারা তাদের (বর-কনে) জন্য কল্যাণ, বরকত ও সৌভাগ্যবান হওয়ার জন্য দোয়া করবে।

 

বর-কনের জন্য ঘরের ব্যবস্থা করা এবং কনেকে সাজানো সুন্নত। আসমা বিনতে ইযাযিদ (রাঃ) বলেন, আমি রাসুল (সাঃ) এর জন্য আয়েশাকে সুসজ্জিত করেছিলাম।